ইরানে চলমান নজিরবিহীন জনবিক্ষোভ দমনে জড়িত থাকার অভিযোগে দেশটির পাঁচ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে ইরানি নেতাদের ব্যক্তিগত ও সরকারি অর্থ বিদেশে পাচারের প্রচেষ্টাকে ‘ডুবে যাওয়া জাহাজ থেকে ইঁদুরের পালানোর’ সঙ্গে তুলনা করে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে ওয়াশিংটন। বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ এই ঘোষণা দেয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন ইরানের ‘সুপ্রিম কাউন্সিল ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি’-এর সচিব এবং ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি)-এর শীর্ষ কয়েকজন কমান্ডার। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এই কর্মকর্তারাই বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের মূল পরিকল্পনাকারী। এছাড়া কুখ্যাত ‘ফারদিস কারাগার’-এর ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, যেখানে নারী বন্দিদের ওপর অমানবিক আচরণের অভিযোগ রয়েছে।
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এক ভিডিও বার্তায় ইরানি নেতাদের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “ডুবে যাওয়া জাহাজ থেকে ইঁদুর যেমন মরণকামড় দিয়ে পালায়, আপনারা তেমনি জনগণের টাকা চুরি করে বিদেশের ব্যাংকে পাঠাচ্ছেন।” তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এই ‘শ্যাডো ব্যাংকিং’ নেটওয়ার্ক এবং পাচারকৃত অর্থের ওপর কড়া নজরদারি রাখছে।
তবে আক্রমণের পাশাপাশি তিনি একটি আলোচনার পথও খোলা রেখেছেন। বেসেন্ট বলেন, “এখনো সময় আছে, যদি আপনারা সহিংসতা বন্ধ করে জনগণের পাশে দাঁড়ান, তবে ট্রাম্প প্রশাসন আপনাদের সাথে কাজ করতে পারে।”
ট্রেজারি বিভাগ কেবল নেতাদের ওপরই নয়, বরং ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য বিক্রির অর্থ পাচারে জড়িত আরও ১৮ জন ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। মূলত ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব কমিয়ে আনাই ট্রাম্পের এই ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ নীতির লক্ষ্য।
নিষেধাজ্ঞা নিয়ে জাতিসংঘে ইরানের মিশন তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য না করলেও, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি স্বীকার করেছেন যে, দুর্নীতি ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে, যা থেকে বিক্ষোভের সূত্রপাত।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এখন ১৯৭৯ সালের পর ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় অস্তিত্বের সংকটে পরিণত হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ (HRANA)-এর তথ্যমতে, এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৪৩৫ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ইরানের প্রতি এই মারমুখী অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। একদিকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আর অন্যদিকে সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি—সব মিলিয়ে তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা এখন এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি।
-এম. এইচ. মামুন









