দাবানলে পুড়ছে ভারতের হিমালয়ের পার্বত্য বনাঞ্চল

যেখানে পৌষ-মাঘের হাড়কাঁপানো শীতে চারপাশ সাদা বরফে ঢাকা থাকার কথা, সেখানে এখন আগুনের লেলিহান শিখা। হিমালয়ের কোল ঘেঁষে অবস্থিত উত্তরাখণ্ডের বিশ্ববিখ্যাত ‘ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স’ এবং নন্দা দেবী জাতীয় উদ্যান এখন ভয়াবহ দাবানলের গ্রাসে। প্রকৃতির এই উল্টো পুরাণ ভাবিয়ে তুলেছে পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানীদের। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শেষ পর্যন্ত ভারতীয় বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার নামাতে হয়েছে।

সাধারণত শীতকালে হিমালয়ের এই উচ্চতায় ভারী তুষারপাত হয়, যা মাটিকে আর্দ্র রাখে। কিন্তু বন দপ্তর ও আবহাওয়াবিদদের তথ্যমতে, চলতি জানুয়ারিতে তুষারপাত ও বৃষ্টিপাত প্রায় হয়নি বললেই চলে। দীর্ঘস্থায়ী এই শুষ্কতার কারণে বনের ঝরা পাতা ও গাছপালা শুকিয়ে কার্যত বারুদের স্তূপে পরিণত হয়েছে। ফলে কোনোভাবে আগুনের সূত্রপাত হতেই তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে দুর্গম পাহাড়ের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।

উত্তরাখণ্ডের এই দাবানল কতটা ভয়াবহ, তা বোঝা যাচ্ছে ইউরোপীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার স্যাটেলাইট চিত্রে। ‘কোপারনিকাস সেন্টিনেল-২’ মিশনের তোলা ছবিতে দেখা গেছে, নন্দা দেবী বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের বিশাল অংশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। ৯ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই আগুন ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি, বরং আগুনের তীব্রতা আরও বেড়েছে। ফরেস্ট সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (FSI) ইতিমধ্যে এই অঞ্চলের জন্য ১ হাজার ৬০০-এর বেশি সতর্কবার্তা জারি করেছে।

পরিবেশবিদদের মতে, এই দাবানল কেবল বনভূমি ধ্বংস করছে না, বরং হুমকির মুখে ফেলেছে হিমালয়ের অমূল্য ও বিরল জীববৈচিত্র্যকে। আগুনের ফলে মাটির বাঁধন আলগা হয়ে যাচ্ছে, যা বর্ষাকালে ভয়াবহ ভূমিক্ষয় ও ধসের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা এই বিপর্যয়ের মূলে দেখছেন ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ বা ক্লাইমেট চেঞ্জকে। তাদের মতে, বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে হিমালয়ের শীতকাল এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি উষ্ণ ও শুষ্ক হয়ে উঠছে। এই আর্দ্রতাহীন পরিস্থিতিই দাবানলকে ডেকে আনছে।

পাহাড়ের দুর্গমতা ও খাড়া ঢালের কারণে সাধারণ পদ্ধতিতে আগুন নেভানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে বিমানবাহিনীর চপার হেলিকপ্টার থেকে জল ছিটিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। বনাঞ্চল সংলগ্ন গ্রামগুলোর মানুষদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

হিমালয়ের এই আগুন কেবল উত্তরাখণ্ডের সমস্যা নয়, এটি বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সংকটের এক জলজ্যান্ত উদাহরণ। বরফের চাদরে ঢাকা পড়ার বদলে হিমালয় পুড়ছে—প্রকৃতির এই সতর্কবার্তা যদি এখন গুরুত্ব না দেওয়া হয়, তবে আগামীতে এ ধরনের দুর্যোগ আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে

তথ্যসূত্রঃ এএনআই

-এম. এইচ. মামুন