রেলে ৩ বছরে লোকসান ৬ হাজার কোটি টাকা

অনিয়ম ও দুর্নীতির যেন আখড়ায় পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। অনিয়মের কারণে মাত্র তিন অর্থবছরেই রেলের পরিচালন লোকসান হয়েছে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। শুধু কেনাকাটাতেই নয়, বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও ব্যাপক লুটপাট হয়েছে রেলে। দুর্নীতির কারণে প্রায় প্রতিটি প্রকল্পের খরচ দ্বিগুণ বেড়েছে। কোনো কোনো প্রকল্পের খরচ ১০ গুণও বেড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, রেলওয়ের কেনাকাটায় এ ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে হরহামেশাই। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় গত জুনে যে প্রতিবেদন দিয়েছে তাতে দেখা গেছে বাজারের চেয়ে ১৫-২০ গুণ বেশি দাম দিয়ে রেলওয়ে নানা যন্ত্রপাতি কিনেছে।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেলের আয় ১ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা হলেও পরিচালন ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেলের মোট পরিচালন লোকসান হয়েছে ১ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। এর আগের ২০২১-২২ অর্থবছরে রেলে সরকারের খরচ হয়েছে ১৬ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে রেলপথ নির্মাণ ও বগি-ইঞ্জিন কেনায় বিনিয়োগ ১২ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা। আর ট্রেন পরিচালন ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা। বিপরীতে আয় হয়েছে ১ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা। ওই বছর রেকর্ড ২ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা পরিচালন লোকসান হয়েছে। আবার ২০২০-২১ অর্থবছরে রেলের পরিচালন লোকসান হয়েছে ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। অথচ ২৫ বছর আগেও বাংলাদেশ রেলওয়ে যাত্রী ও পণ্য পরিবহণের আয় দিয়ে ট্রেন পরিচালনার সব ব্যয় মিটিয়ে কিছু অর্থ উদ্বৃত্ত থাকত। ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে রেলের পরিচালন উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা। বর্তমানে উদ্বৃত্ত দূরের কথা, লোকসান ছাড়িয়েছে হাজার কোটি টাকা।

রেলে পরিচালন লোকসানের বিষয় জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) মো. আরিফুজ্জামান বলেন, এসব তথ্যভিত্তিক কথা তো অনুমান করে বলা যাবে না। তাছাড়া রেলে পরিচালন ব্যায় কি হবে না এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, পরিচালন লোকসানের উত্তর আমি দিতে পারবো না কারন আমি যে ডিপার্টমেন্টে কাজ করি আমার কাজ অন্য।
জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়েতে ২০১৯-২০ এবং ২০২০-২১, এই দুটি অর্থবছরে ভয়ংকর সব অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে।

সংবিধানের ১৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সদ্য সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী গত ৩ জুলাই বুধবার জাতীয় সংসদে ৪৯টি অডিট ও হিসাব রিপোর্ট উপস্থাপন করেছিলেন। এর মধ্যে রেলওয়ের মোট চারটি প্রতিষ্ঠানের উল্লেখিত দুই অর্থবছরের হিসাব-সম্পর্কিত কমপ্লায়েন্স রিপোর্টে মোট ৭৭ কোটি ৫ লাখ ৭১ হাজার ২৩৩ টাকা অনিয়মের তথ্য রয়েছে।

সূত্র মতে, বন্ধ থাকা সত্ত্বেও ডেমু ট্রেন চলাচলে জ্বালানি-যন্ত্রাংশ ক্রয় ও মেরামত দেখিয়ে টাকা উত্তোলন, বাজারমূল্য অপেক্ষা বেশি মূল্যে মালামাল কেনা, কারখানায় লোকো-কোচ-ওয়াগন না থাকা সত্ত্বেও মালামাল বাবদ খরচ দেখিয়ে বিল উত্তোলন, কোনো মালামাল না কিনেই চালান দেখিয়ে টাকা নেওয়া, মেরামতযোগ্য আইটেম হওয়া সত্ত্বেও মেরামত না করে অপ্রয়োজনীয়ভাবে যন্ত্রাংশ কেনা, নিরাপত্তাসামগ্রী না কিনেই বিল প্রদান, মেশিন ওভারহলিংয়ের কাজ সম্পাদন না করেই ঠিকাদারকে বিল দেওয়া, চুক্তি অনুযায়ী প্রোসল না দিলেও ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ এবং লোকোমোটিভে মালামাল ঘাটতি দেখিয়ে টাকা উত্তোলনের মাধ্যমে উক্ত অর্থ নয়ছয় করা হয়েছে। এছাড়াও নিজস্ব কারখানায় কাজের সক্ষমতা থাকার পরেও চুক্তির মাধ্যমে ঠিকাদার দিয়ে কাজ করানো, প্রয়োজন না থাকলেও অতিরিক্ত মালামাল ক্রয় এবং আবাসিক ভবন মেরামত না করা সত্ত্বেও ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ দেখিয়ে সরকারের আর্থিক ক্ষতি করেছে রেলওয়ে।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) পুরকৌশল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সুদীপ কুমার পাল বলেন, রেলে লোকসানের মূল কারণ হচ্ছে অপরিকল্পিত প্রকল্প। যাচাই-বাছাই ছাড়াই প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। নতুন রেলপথ নির্মাণে যে ব্যয় হচ্ছে, তা বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি। ক্রয় থেকে শুরু করে পরিচালনা- সব দিকেই সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। তবেই লাভের মুখ দেখা সম্ভব হবে।
রেলওয়েতে আর্থিক কেলেঙ্কারির চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশের কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল কিংবা বাংলাদেশের মহা হিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়ের নিরীক্ষায় (অডিট)। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান অডিট অধিদপ্তর রেলওয়ের দুটি প্রতিষ্ঠানের ২০১৯-২০, একটি প্রতিষ্ঠানের ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ এবং আরেকটি প্রতিষ্ঠানের ২০২০-২১ অর্থবছরের হিসাব-সম্পর্কিত কার্যক্রমের ওপর কমপ্লায়েন্স অডিট বা নিরীক্ষা পরিচালনা করেছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের স্টোর বিভাগের ক্রয় ব্যবস্থাপনা এবং প্রধান প্রকৌশলীর আওতাধীন আবাসিক ভবন, অফিস ভবন মেরামত ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত ২০১৯-২০ অর্থবছরের হিসাব-সম্পর্কিত কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টে ২৯ কোটি ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৮০৭ টাকা ক্ষতির তথ্য রয়েছে। রেলওয়ের কারখানাসমূহের ২০১৯-২০ অর্থবছরের হিসাব-সম্পর্কিত কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টে রয়েছে ১৪ কোটি ৩৭ লাখ ৪৬ হাজার ৯৯২ টাকা ক্ষতির কথা। রেলওয়ের প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলী, পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলের ২০১৯-২০ এবং ২০২০-২১ অর্থবছরের হিসাব-সম্পর্কিত কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টে ১০ কোটি ৫৯ লাখ ৪৪ হাজার ৬৬১ টাকার আপত্তি রয়েছে। এছাড়া, রেলওয়ের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক, প্রধান সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী এবং প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক, সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (পূর্ব ও পশ্চিম) কার্যালয়ের ২০২০-২১ অর্থবছরের হিসাব-সম্পর্কিত কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টে ২৩ কোটি ২ লাখ ৯২ হাজার ৭৭৩ টাকা অনিয়মের তথ্য উল্লেখ রয়েছে।
রেলওয়ের প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলী, পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলের ২০১৯-২০ এবং ২০২০-২১ অর্থবছরের হিসাব-সম্পর্কিত কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টে বলা হয়েছে- লালমনিরহাটের বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজার ২০১৯ সালের ১০ জুন এক চিঠিতে জানান, দুই সেট ডেমু ট্রেনের মধ্যে এক সেট দীর্ঘদিন যাবৎ যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে পার্বতীপুরে অবস্থান করে। অবশিষ্ট এক সেট দীর্ঘদিন চলাচলের পর যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ বন্ধ হয়ে যায়। এই দুই সেট ডেমু ট্রেন বন্ধ থাকাকালীন ১৭১২ লিটার জ্বালানি তেল এবং ৩২২ লিটার লুবঅয়েল ইস্যু করা হয়েছে, যার মূল্য ২ লাখ ৭৫ টাকা। নিরীক্ষায় দেখা যায়, বন্ধ থাকা ডেমু ট্রেন দুটির বিপরীতে চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় ২ কোটি ৪৪ লাখ ৬৮ হাজার ৬৬৬ টাকার যন্ত্রাংশ কিনে পার্বতীপুর ডিপোতে পাঠিয়েছে। বন্ধ ডেমু ট্রেনের জ্বালানি ও যন্ত্রাংশ কেনার এই কারসাজিতে সরকারের মোট ক্ষতি হয়েছে ২ কোটি ৪৬ লাখ ৬৮ হাজার ৭৪১ টাকা।

এই অনিয়মের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চেয়েছিল অডিট অধিদপ্তর। তবে, কর্তৃপক্ষের জবাব গ্রহণযোগ্য হয়নি। জবাবের পরিপ্রেক্ষিতে নিরীক্ষা মন্তব্যে লেখা হয়েছে- জবাবে শুধু জ্বালানি তেল ব্যবহারের বিষয়ে বলা হয়েছে। অথচ, দীর্ঘদিন যাবৎ বন্ধ থাকা ডেমু ট্রেন মেরামতের জন্য মালামাল ক্রয় ও মজুতের বিষয়ে জবাব দান থেকে বিরত থাকে। এতে অনিয়মের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ক্ষতির সম্পূর্ণ অর্থ দায়ীদের কাছ থেকে আদায়ের সুপারিশ করেছে অডিট অধিদপ্তর।

এদিকে, রেলওয়ের কারখানাসমূহের ২০১৯-২০ অর্থবছরের হিসাব-সম্পর্কিত কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টে বলা হয়েছে- পার্বতীপুর এবং চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর কর্মব্যবস্থাপক (ডিজেল) কার্যালয়ের রেকর্ডসমূহ নিরীক্ষায় দেখা গেছে, পার্বতীপুরে ডেমু ট্রেন বন্ধ থাকা সত্ত্বেও ২০২০ সালের ৩১ মার্চ পঞ্চগড়-পার্বতীপুর-লালমনিরহাট রুটে চলাচলকারী ডেমু ট্রেনের মেরামতকাজ দেখিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স সামসুদ্দিন ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস’কে ৮ লাখ ৯ হাজার ৩১০ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এছাড়া, পাহাড়তলীর কর্মব্যবস্থাপকের (ডিজেল) কার্যালয়ে ডেমু ট্রেনের ইন্টার ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভের নরমাল লাইফ/এভারেজ লাইফ সমাপ্তির আগেই, কেনার সাত বছরের মধ্যে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি করে ২ কোটি ৯০ লাখ ২৩ হাজার ৭৩০ টাকা ব্যয় করা হয়। মেরামত ও ইন্টার ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ বাবদ খরচে সরকারের মোট ক্ষতি হয়েছে ২ কোটি ৯৮ লাখ ৩৩ হাজার ৪০ টাকা।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রেলওয়ে এমনিতেই দুর্নীতিগ্রস্ত। ব্যাপক দুর্নীতির কারণে রেলওয়ে বিকল্প গণপরিবহন হতে পারেনি। অডিট আপত্তি যেহেতু উঠেছে কাজেই ধরে নেওয়া যায় এখানে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। এটি পরস্পরের যোগসাজশে হয়েছে। কাজেই ঠিকাদারদের পাশাপাশি এ অনিয়মের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের যারা জড়িত, তাদের সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

রেলওয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের রেলের সর্বোচ্চ অপারেটিং রেশিও ছিল ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে, ৯৫ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ ওই সময়ে ১ টাকা আয় করতে রেলের ব্যয় হয়েছিল ৯৫ দশমিক ৯ পয়সা। এরপর থেকে এই রেশিও ক্রমাগত বেড়েছে।

এ বিষয়ে জানতে রেলপথ মন্ত্রনালয় বিষয়ক উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, পরিচালন লোকসান দূরীকরণে আমি যোগদানের পরই রেলের খরচ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছি। পাশাপাশি রাজস্ব বাড়ানোর জন্য পদক্ষেপ নিয়েছি। যার ফল শিগগিরই দেশের জনগন উপভোগ করবে।
তিনি বলেন, কিছু লাইনের দশ বছর মেয়াদী আউট সোসিং করা ছিল রাজস্ব বাড়াতে সেগুলো আমরা শিগগিরই উম্মুক্ত করে দিব।

-হাসান মাহমুদ রিপন