আসামের সংগীত জগতের উজ্জ্বল তারকা জুবিন গর্গের আকস্মিক মৃত্যু ভারতের সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন ও জল্পনা তৈরি করেছিল। অনেকে অনুমান করেছিলেন, এমন হঠাৎ মৃত্যুর পেছনে হয়তো কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা বা নাশকতা জড়িত থাকতে পারে। কিন্তু সিঙ্গাপুর পুলিশের সাম্প্রতিক তদন্ত সে সব জল্পনাকে বাতিল করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, জুবিন গর্গের মৃত্যু সম্পূর্ণ দুর্ঘটনাজনিত এবং এতে কোনো অপরাধমূলক কার্যকলাপ বা তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
জুবিন গর্গ শুধু আসামের নয়, পুরো ভারতবর্ষের জনপ্রিয় শিল্পী ছিলেন। তিনি হিন্দু–মুসলিম বিভাজনের মধ্যেও সমানভাবে সবার প্রশংসা ও ভালোবাসা পেয়েছিলেন। তার কণ্ঠ ও শিল্পকর্ম বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেছিল। আসামের সঙ্গীত মহলে তার অবদান অনস্বীকার্য। বিশেষ করে তিনি যেভাবে লোকসংগীত এবং আধুনিক সংগীতের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করেছিলেন, তা তাকে অন্যান্য শিল্পীর থেকে আলাদা স্থান দিয়েছে।
গত বছর ১৯ সেপ্টেম্বর, সিঙ্গাপুরের লাজারাস আইল্যান্ডে সাঁতার কাটার সময় জুবিন গর্গ পানিতে ডুবে যান। প্রথমদিকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছিল, তিনি স্কুবা ডাইভিংয়ের সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। তবে তদন্তে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, ঘটনার সময় তিনি কোনো ডাইভিং করছিলেন না। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, জুবিন নিজের ইয়ট থেকে সাঁতরে ফিরে আসার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই নিস্তেজ হয়ে পানিতে ভেসে ওঠেন।
শুনানিতে সিঙ্গাপুর পুলিশ কোস্টগার্ডের সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট ডেভিড লিম জানান, ঘটনার সময় জুবিন গুরুতরভাবে মদ্যপ ছিলেন। একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী আদালতে বলেছেন, জুবিনকে ইয়টের দিকে সাঁতরে ফেরার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। কিছুক্ষণ পরে তিনি নিস্তেজ হয়ে পানিতে ভেসে ওঠতে থাকেন। দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসার চেষ্টা করা হয়। উদ্ধারকালে তাকে ইয়টে তুলে সিপিআর দেওয়া হয়, কিন্তু সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু হয়।
তদন্তের আরও তথ্য অনুসারে, জুবিন দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ রক্তচাপ এবং মৃগী রোগে ভুগছিলেন। ২০২৪ সালে তার মৃগীর সর্বশেষ আক্রমণের রেকর্ডও রয়েছে। তার স্বাস্থ্যগত সমস্যাগুলো দুর্ঘটনার সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গুরুতর মদ্যপান ও প্রাকৃতিক শারীরিক সমস্যা একসঙ্গে থাকায় জুবিন সাঁতরে নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি।
জুবিন গর্গের মৃত্যু সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পরেই অনুরাগী এবং শিল্পমহল শোকাহত হন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনুরাগীরা বিভিন্ন পোস্টে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। অনেকেই লিখেছেন, জুবিনের গান ভবিষ্যত প্রজন্মকেও অনুপ্রাণিত করবে এবং ভারতীয় সঙ্গীত ইতিহাসে তার নাম চিরকাল উজ্জ্বল থাকবে।
জুবিনের জীবন কেবল শিল্পী হিসেবে নয়, বরং মানুষের প্রতি সহানুভূতি, বন্ধু এবং সহকর্মীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের জন্যও স্মরণীয়। তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সক্রিয় ছিলেন। অসংখ্য নতুন শিল্পীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং তাদের সঙ্গীতজগতে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করেছেন। এর ফলে জুবিন কেবল একজন শিল্পী হিসেবে নয়, এক শিক্ষাবিদ ও গুরুও ছিলেন।
তার আকস্মিক মৃত্যু নিয়ে যেসব গুঞ্জন শোনা গেছে, তা অনেকের কৌতূহল ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু সিঙ্গাপুর পুলিশ স্পষ্ট করে জানিয়েছে, কোনো অপরাধমূলক কার্যকলাপ ঘটেনি। সব সাক্ষ্য, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবৃতি এবং তদন্তের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। আদালত ও পুলিশ নিশ্চিত করেছেন, তৃতীয় পক্ষের কোনো হস্তক্ষেপ ঘটেনি।
তার মৃত্যুতে কেবল শোক নয়, শিল্পী মহলে গভীর উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। অনেকে মনে করছেন, জুবিনের মতো প্রতিভাধর শিল্পীকে হারানো সঙ্গীতপ্রেমীদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তবে পুলিশ তদন্তের রিপোর্ট স্পষ্ট করেছে, এটি সম্পূর্ণ দুর্ঘটনাজনিত এবং স্বাস্থ্যগত কারণে ঘটে। এই তথ্য অনুরাগীদের মধ্যে অন্তত এক ধরনের মানসিক স্বস্তি এনে দিয়েছে যে, জুবিনের মৃত্যু কোনো ষড়যন্ত্র বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে হয়নি।
জুবিন গর্গের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় সঙ্গীতজগতে শোকের ছায়া নেমে আসে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে শিল্পী ও অনুরাগীরা স্মৃতিচারণ শুরু করেন। অনেকে তাকে ভারতের সঙ্গীত ইতিহাসের এক অমর প্রতিভা হিসেবে তুলে ধরেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বহু পোস্টে তার গান ও শিল্পী জীবনের প্রশংসা করা হয়েছে।
জুবিনের মৃত্যুর পর অনুরাগীরা তার গান ও সঙ্গীতকে স্মরণ করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে শ্রদ্ধা জানানো, গান শেয়ার করা এবং তার শিল্পী জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হচ্ছে। অনেকে লিখেছেন, জুবিনের কণ্ঠ ও শিল্পী জীবন ভবিষ্যত প্রজন্মকেও অনুপ্রাণিত করবে।
জুবিনের জীবন ও কর্মের বিবেচনায় দেখা যায়, তিনি সবসময় সংবেদনশীল এবং সৃজনশীল ছিলেন। সঙ্গীতের প্রতি তার ভালোবাসা এবং শিল্পী হিসেবে পরিশ্রম তাকে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও পরিচিতি এনে দিয়েছে। তিনি একাধিক গানের মাধ্যমে শুধু বিনোদন দিয়েছেন না, বরং মানুষের আবেগকেও স্পর্শ করেছেন। তার কণ্ঠে থাকা আবেগ এবং শিল্পের গভীরতা অতি কম শিল্পীর মধ্যে দেখা যায়।
শুধু ভারত নয়, বিদেশের বিভিন্ন দেশেও জুবিনের গান জনপ্রিয় ছিল। তিনি বিদেশে সঙ্গীত পরিবেশনা করেছেন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফেস্টিভালেও অংশগ্রহণ করেছেন। এভাবে তার সঙ্গীত জীবনের মাধ্যমে তিনি ভারতীয় সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি দিতে সক্ষম হন।
জুবিন গর্গের জীবনের উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো তার সামাজিক সংবেদনশীলতা। তিনি বহু সামাজিক অনুষ্ঠান ও চ্যারিটি ইভেন্টে অংশগ্রহণ করেছেন। নতুন শিল্পীদের সহায়তা করেছেন এবং সঙ্গীত শিক্ষায় অবদান রেখেছেন। এই দিকটি তাকে শুধুমাত্র একজন শিল্পী হিসেবে নয়, বরং সমাজে একটি দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্ব হিসেবেও পরিচিত করেছে।
জুবিন গর্গের মৃত্যুতে কোনো অপরাধমূলক কার্যকলাপ, নাশকতা বা তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ নেই। এটি সম্পূর্ণ দুর্ঘটনাজনিত এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। উচ্চ রক্তচাপ, মৃগী রোগ এবং গুরুতর মদ্যপান—এই তিনটি কারণে তিনি পানিতে নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি। পুলিশ ও আদালতের তদন্তে সমস্ত প্রমাণ যাচাই করা হয়েছে।
-বিথী রানী মণ্ডল










