‘তাসের ঘর’ হয়ে যাচ্ছে ৭৬ বছরের জোট

স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডকে ‘জোরপূর্বক দখলের’ মার্কিন হুমকিকে কেন্দ্র করে উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোটে (ন্যাটো) নজিরবিহীন ফাটল দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনমনীয় অবস্থানের বিপরীতে ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একজোট হয়েছে ইউরোপের শক্তিশালী দেশগুলো। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যেই জার্মানি, ফ্রান্স, সুইডেন এবং নরওয়ে গ্রিনল্যান্ডে তাদের সামরিক ইউনিট পাঠানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোট ন্যাটো কি তবে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের আকস্মিক হুমকি এবং এর জবাবে ইউরোপীয় দেশগুলোর পাল্টা সামরিক তৎপরতা সেই প্রশ্নই বড় করে তুলেছে। গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ন্যাটোর প্রধান চার দেশ—জার্মানি, ফ্রান্স, সুইডেন ও নরওয়ে—সেখানে সেনা পাঠানোর ঘোষণা দেওয়ায় পরিস্থিতি এখন অগ্নিগর্ভ।

ঘটনার সূত্রপাত ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট থেকে। যেখানে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অন্য কোনো বিকল্প নেই। হোয়াইট হাউস থেকে প্রয়োজনে ‘শক্তি প্রয়োগের’ ইঙ্গিত আসার পরপরই নড়েচড়ে বসে ইউরোপ।

ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বের প্রতি সংহতি জানিয়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ নিশ্চিত করেছেন, তাদের একটি বিশেষ সামরিক ইউনিট ইতোমধ্যেই গ্রিনল্যান্ডের পথে। অন্যদিকে জার্মানি ১৩ সদস্যের একটি অগ্রবর্তী দল পাঠিয়েছে। দীর্ঘদিনের মিত্র হয়েও খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধেই এই সামরিক অবস্থান ন্যাটোর ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেনের একটি মন্তব্য বিশ্বজুড়ে শোরগোল ফেলে দিয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, “একটি মিত্র দেশ যদি অন্য মিত্রের ভূখণ্ড দখল করার চেষ্টা করে, তবে বুঝতে হবে ন্যাটোর মৃত্যুঘণ্টা বেজে গেছে।” রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তবে ইউরোপীয় দেশগুলো ন্যাটোর আর্টিকেল-৫ (যৌথ প্রতিরক্ষা নীতি) অনুযায়ী আমেরিকার বিপক্ষেই অবস্থান নিতে পারে।

এদিকে ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ডেনমার্কের প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করলেও বরফ গলেনি। সমঝোতার বদলে পাল্টাপাল্টি হুঙ্কার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এই উত্তেজনার মধ্যেই গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুক-এ কানাডা এবং ফ্রান্স তাদের নতুন কনস্যুলেট খোলার তোড়জোড় শুরু করেছে, যা মূলত গ্রিনল্যান্ডের ওপর ডেনমার্কের কর্তৃত্বকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়ার একটি কৌশল।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে একটি দুর্ভেদ্য মার্কিন ঘাঁটি বানাতে চান। কিন্তু মিত্রদের সাথে আলোচনা না করে সরাসরি ‘দখলের’ হুমকি দেওয়ায় হিতে বিপরীত হয়েছে। গ্রিনল্যান্ডের বরফে এখন ইউরোপীয় সেনাদের যে বুটের শব্দ শোনা যাচ্ছে, তা কি কেবল মহড়া নাকি ট্রাম্পকে ঠেকানোর চূড়ান্ত প্রস্তুতি—তা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে।

আটলান্টিকের দুই পাড়ের এই দ্বন্দ্ব যদি দ্রুত নিরসন না হয়, তবে ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সামরিক জোটের কফিনে শেষ পেরেকটি হয়তো গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতেই পড়তে যাচ্ছে।

বুধবার ডেনমার্ক সরকারের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ন্যাটোর মিত্র দেশগুলোর সহযোগিতায় তারা গ্রিনল্যান্ডে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করছে। ডেনমার্কের অনুরোধে সাড়া দিয়ে জার্মানি ১৩ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ সামরিক দল পাঠাচ্ছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ নিশ্চিত করেছেন, ফ্রান্সের প্রথম সামরিক ইউনিটটি ইতোমধ্যেই গ্রিনল্যান্ডের পথে রয়েছে। সুইডেন এবং নরওয়েও নুক-এ (গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী) তাদের বিশেষ প্রতিনিধি ও সামরিক দল পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। মূলত ডেনমার্কের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যৌথ মহড়ার মাধ্যমেই এই ছোট ছোট দলগুলো ট্রাম্পের সম্ভাব্য পদক্ষেপের বিরুদ্ধে একটি ‘প্রতিরক্ষা বলয়’ তৈরির চেষ্টা করছে।

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন, “কোনো মিত্র দেশের ভূখণ্ড দখল করার চেষ্টা করা হলে তা হবে ন্যাটোর মৃত্যুঘণ্টার সমান।” বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কোনো মিত্র দেশের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন আগ্রাসী মনোভাব জোটের ৭৬ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি করেছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতি শান্ত করতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ওয়াশিংটনে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তবে গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব ইস্যুতে দুই পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকায় আলোচনা কোনো আলোর মুখ দেখেনি। এই উত্তেজনার মধ্যেই গ্রিনল্যান্ডে নিজেদের কূটনৈতিক উপস্থিতি বাড়াতে কানাডা এবং ফ্রান্স নুক-এ নতুন কনস্যুলেট খোলার পরিকল্পনা করছে।

অন্যদিকে, গ্রিনল্যান্ড সংকটের সমান্তরালে ইউক্রেন ফ্রন্টেও বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। ইউক্রেনের নবনিযুক্ত ৩৫ বছর বয়সী প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ স্বীকার করেছেন যে, তাদের সেনাবাহিনীতে প্রায় ২ লাখ সেনা অনুমতি ছাড়াই দায়িত্ব থেকে অনুপস্থিত রয়েছেন। তিনি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের ওপর জোর দিয়ে বলেন, “যত বেশি রোবট ও প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে, তত কম বীর সেনা প্রাণ হারাবে।”

প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি মিখাইলো ফেদোরভকে সেনাবাহিনীর প্রযুক্তিগত রূপান্তরের প্রধান দায়িত্ব দিয়েছেন, যা রাশিয়ার বিরুদ্ধে অসম লড়াইয়ে ইউক্রেনের নতুন কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

-এম. এইচ. মামুন