শেয়ারবাজারে স্থির মূল্য পদ্ধতি বা ফিক্সড প্রাইস মেথডে প্রিমিয়াম বা অধিমূল্য ও ডিসকাউন্ট প্রাইস বা ছাড়কৃত দামে শেয়ার ছাড়তে পারবে শেয়ারবাজারে আসা নতুন কোম্পানিগুলো। এত দিন স্থির মূল্য পদ্ধতিতে শুধু অভিহিত মূল্য বা ফেসভ্যালুতে শেয়ার ছাড়ার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। এখন আইন পরিবর্তন করে স্থির মূল্য পদ্ধতিতে অধিমূল্য ও ছাড়কৃত মূল্যে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) শেয়ার ছাড়ার বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
আইপিও–সংক্রান্ত পাবলিক অফার অব ইকুইটি সিকিউরিটিজ বিধি সংশোধন করে এই বিধান যুক্ত করা হয়েছে। ২০১৫ সালে আইপিও–সংক্রান্ত বিধি সংশোধন করে স্থির মূল্য পদ্ধতিতে বাজারে আসা কোম্পানির প্রিমিয়াম দাবির বিষয়টি বাতিল করা হয়েছিল। ওই বিধিতে প্রিমিয়াম দাবি করা কোম্পানির জন্য বুক বিল্ডিং বা দরপত্র পদ্ধতির মাধ্যমে শেয়ারবাজারে আসার বিধান করা হয়। এখন সেই বিধান বাদ দিয়ে আবারও স্থির মূল্য পদ্ধতিতে প্রিমিয়াম দাবির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বুধবার, (১৪ জানুয়ারি) সংশোধিত পাবলিক অফার অব ইকুইটি সিকিউরিটিজ-সংক্রান্ত সংশোধিত বিধি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানানো হয়। এতে আইপিওর সংশোধিত বিধির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক এম হাছান মাহমুদ, পরিচালক মো. আবুল কালাম, অতিরিক্ত পরিচালক শেখ মো. লুৎফুল কবির প্রমুখ।
এর আগে আইপিওতে লটারি প্রথা বাতিল করে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ও জমা অর্থের ভিত্তিতে আনুপাতিক হারে শেয়ার বরাদ্দ করা হতো। আর এ জন্য আইপিওর শেয়ারের আবেদনের ক্ষেত্রে আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের সেকেন্ডারি বাজারে ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগ থাকা বাধ্যতামূলক ছিল।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, যেসব কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ৩০ কোটি থেকে ১২৫ কোটি টাকার মধ্যে সেগুলো চাইলে স্থির মূল্য পদ্ধতি বা বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে যেকোনো একটির মাধ্যমে আইপিওতে আসতে পারবে। তবে ১২৫ কোটি টাকার বেশি পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানিগুলোকে আইপিওর মাধ্যমে বাজারে আসতে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারের দাম নির্ধারণ করতে হবে। তবে সরকারি নিবন্ধন বা লাইসেন্সে ব্যবসা পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলো উভয় পদ্ধতিতে বাজারে আসতে পারবে।
এ ছাড়া সংশোধিত বিধিতে সরকারি–বেসরকারি কোম্পানি বাজারে আসার ক্ষেত্রে গ্রিনফিল্ড সুবিধা নিতে পারবে। গ্রিনফিল্ড সুবিধা হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে কিছু কোম্পানিকে কার্যক্রম শুরুর আগে বাজারে শেয়ার ছেড়ে টাকা তোলার বিশেষায়িত সুবিধা দেওয়া হয়। বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে এখন পর্যন্ত এ পদ্ধতিতে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ দেওয়া হয় শুধু বহুজাতিক সিমেন্ট কোম্পানি লাফার্জহোলসিমকে। সংশোধিত আইপিও–সংক্রান্ত বিধিতে সরকারি–বেসরকারি ভালো মানের সব কোম্পানির ক্ষেত্রে এই সুবিধার আইনি ভিত্তি দেওয়া হয়েছে।
আরও কয়েকটি বিধান ছাড়কৃত মূল্যে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর শেয়ার ছাড়া যাবে। গ্রিনফিল্ড সুবিধা পাবে সরকারি–বেসরকারি সব কোম্পানি। স্বাধীনভাবে মতামত দিতে পারবে স্টক এক্সচেঞ্জ। আইপিওতে বিনিয়োগকারীর শেয়ার বণ্টন হবে লটারিতে।
বিএসইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, যেসব কোম্পানির ব্যবসায়ের রেকর্ড ভালো, যাদের এক বা একাধিক কোম্পানি ইতিমধ্যে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে এবং আর্থিক ভিত্তি খুব শক্তিশালী সেসব উদ্যোক্তার নতুন প্রকল্পকে এ সুবিধা দেওয়া হবে। অর্থাৎ ভালো উদ্যোক্তা হিসেবে দেশে এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ও স্বীকৃতি রয়েছে এমন উদ্যোক্তারাই এ সুবিধা পাবেন, যাতে তাঁরা ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ পান। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু শর্ত মানতে হবে। গ্রিনফিল্ড সুবিধা নিয়ে যেসব কোম্পানি বাজারে আসবে সেগুলোকে তালিকাভুক্তির দুই বছরের মধ্যে মুনাফার নিশ্চয়তা দিতে হবে। আর এ ধরনের কোম্পানি মুনাফায় না আসা পর্যন্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা–পরিচালকদের ৭৫ শতাংশ শেয়ার ধারণ বাধ্যতামূলক।
এ ছাড়া শেয়ারবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওতে বিনিয়োগকারীদের জন্য আবারও লটারি ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এখন থেকে শেয়ারবাজারে আইপিওতে আসা কোম্পানির শেয়ারের বিনিয়োগকারীদের অংশ বণ্টন হবে লটারির মাধ্যমে। এর আগে আইপিওতে লটারি প্রথা বাতিল করে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ও জমা অর্থের ভিত্তিতে আনুপাতিক হারে শেয়ার বরাদ্দের বিধান করা হয়। এ জন্য আইপিওর শেয়ারের আবেদনের ক্ষেত্রে আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের সেকেন্ডারি বাজারে ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগ থাকা বাধ্যতামূলক ছিল। সেই বিধান বাতিল করে এখন আবার লটারি পদ্ধতি ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সংশোধিত আইপিও বিধি অনুযায়ী আইপিওতে আসা কোম্পানিগুলোকে তাদের মূলধনের ন্যূনতম ১০ শতাংশ শেয়ার বাজারে ছাড়তে হবে। তবে ৩০ কোটি টাকার কম পরিশোধিত মূলধনের কোনো কোম্পানি আইপিওর মাধ্যমে শেয়ার ছেড়ে টাকা তুলতে পারবে না। ৩০ কোটি টাকার মূলধনের কোনো কোম্পানি বাজারে আসতে চাইলে সেটিকে আইপিওতে ন্যূনতম ২০ কোটি টাকার শেয়ার ছাড়তে হবে, যাতে পরিশোধিত মূলধন কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকা হয়। তবে ভালো মৌলভিত্তির বহুজাতিক কোম্পানি ও বড় কোম্পানির ক্ষেত্রে এই শর্ত কিছুটা শিথিল থাকবে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, শেয়ারবাজারে আইপিওতে নতুন কোম্পানি আনার ক্ষেত্রে স্টক এক্সচেঞ্জকে অধিকতর ক্ষমতাশালী করা হয়েছে। আইপিওতে আসতে আগ্রহী কোম্পানিগুলোর প্রসপেক্টাস বা বিবরণীর ওপর বস্তুনিষ্ঠ যেকোনো মতামত দিতে পারবে স্টক এক্সচেঞ্জ। এমনকি কোম্পানির কারখানা ও কার্যালয় পরিদর্শনের ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে স্টক এক্সচেঞ্জকে। তারা কোনো কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত না করার বিষয়ে মতামত দিলে সেটি অবশ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিতে আপিলের সুযোগ পাবে।
এ ছাড়া আইপিওর অর্থে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যাংকঋণ পরিশোধের বিধান যুক্ত করা হয়েছে সংশোধিত বিধিতে। তবে সেটিও করা যাবে যে পরিমাণ অর্থ ঋণ পরিশোধে ব্যয় করা হবে তার সমপরিমাণ অর্থ কোম্পানির ব্যবসা সম্প্রসারণ বা আধুনিকায়নে ব্যবহারের শর্তে।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএসইসির পরিচালক আবুল কালাম বলেন, প্লেসমেন্ট শেয়ারের মাধ্যমে কোম্পানির মূলধন বৃদ্ধির অনুমোদনের বিষয়টি আবারও বিএসইসির হাতে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি বর্তমান কমিশনের বিবেচনায় রয়েছে। কোম্পানির শেয়ার ইস্যু ও মূলধন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফেরাতে এই অনুমোদন ফিরিয়ে আনার কথা ভাবা হচ্ছে। আগেও দেশের যেকোনো কোম্পানিকে মূলধন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিএসইসির অনুমোদন নিতে হতো। কয়েক বছর আগে বিএসইসি এক নির্দেশনার মাধ্যমে সেই অনুমোদন প্রক্রিয়া থেকে সরে আসে।
-সানা










