সারাদেশের মতো রাজধানী ঢাকায়ও তীব্র রান্নার গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। সারাদিন বাসাবাড়িতে গ্যাসের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। রাত ১২টার পর আসে গ্যাস, সকাল ৬-৭টা পর্যন্ত থাকে। পাশাপাশি যেসব বাসায় গ্যাসের লাইন নেই তারাও এলপিজির দাম বাড়ায় বিপাকে পড়েছেন। উচ্চমূল্যে কিনতে হচ্ছে এলপিজি। গ্যাস সংকট সমাধানে আজ বুধবার ব্যবসায়ীর সঙ্গে বৈঠক ডেকেছে বিইআরসি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করে চাকরির প্রস্তুতির জন্য ঢাকায় এসেছেন নুসরাত জাহান। নিজেই রান্না করতেন, ভালোই চলছিল তার। কিন্তু বিপত্তি বাধে দুই-তিন সপ্তাহ ধরে। কারণ তিনি গ্যাসের অভাবে বাসায় আর রান্না করতে পারছেন না। তাই বাধ্য হয়ে এখন বৈদ্যুতিক চুলা কিনতে বাজারে এসেছেন। তার সাথে কথা হয় মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেট বাজারে। তিনি আক্ষেপ করে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘পড়াশোনা শেষ করে ঢাকায় আসলাম ভালো প্রস্তুতি নিয়ে একটা চাকরির আশায়, এখন নিজেই খেতে পারি না। জীবন বাঁচানোই দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার এখন সারাদিন উপবাস থাকার মতো অবস্থা, মাঝ রাতে গ্যাস আসে। সারাদিন গ্যাসের দেখা পাই না।’
তিনি আরোও বলেন, ‘আমার এখন জীবন বাঁচানোই দায় হয়ে দঁড়িয়েছে, তাই এখন কারেন্টের চুলা (বৈদ্যুতিক চুলা) কিনতে এসেছি।’
রাজধানীর পল্লবীর বাসিন্দা একরাম হোসেন। ছোট চাকরি করেন। পাশাপাশি দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে তার সংসার। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘পল্লবীতে গ্যাস সংকট বলে কিছু নাই! রাত ১টার পর সামান্য গ্যাস আসে, ভোরের আগেই চলে যায়। গ্যাস নিয়ে কারও মাথা ব্যথা নেই। ইলেকট্রনিকস চুলা, সিলিন্ডারে সবাই নির্ভরশীল।’
মিরপুরের কালশী এলাকায় থাকেন মাহাবুবুর রহমান। পেশায় সাংবাদিক মাহাবুব গ্যাসের বর্তমান অবস্থা নিয়ে খুবই বিরক্ত। তিনি আলোকিত স্বদেশকে বলেন, ‘গত কয়েক মাস ধরে দিনে গ্যাস থাকে না, রাত ১২টায় আসে ভোর পর্যন্ত থাকে। তাই বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করছি। আবার লাইনের গ্যাসের বিলও দিচ্ছি।’
মিরপুর দুই নম্বারের বাসিন্দা আহসান হাবীব বাপ্পি বলেন, ‘লাইনে গ্যাস নেই, দোকানে সিলিন্ডার গ্যাস নেইÑ কি একটা অবস্থা। আমি বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছি।’
‘রান্নার কাজে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহারের কারণে বিদ্যুৎ বিল অনেকটাই বেড়ে যাবে’, অভিযোগ তার।
মালিবাগ এলাকার এমদাদ খান বলেন, ‘আমার বাসা শান্তিবাগ, মালিবাগ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গ্যাসের দেখা মেলে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘ গ্যাস না থাকার কারণে চড়া দামে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। আবার অনেক দোকানে সিলিন্ডার মজুদ থাকলেও পরিচিতজন ছাড়া দাম দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না।’
তেজগাঁও এলাকার মুদি দোকানদার হযরত আলী বলেন, ‘তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, বিকালের আগে বড় খাবার কিছুই রান্না করা যায় না, একটা রুটি ভাজতে ১৫-২০ মিনিটের মতো লাগে।’
শুধু এসব এলাকায় নয়, রাজধানীর প্রায় সব এলাকাতেই হাজারো পরিবার কয়েকদিন ধরে পাইপলাইনের গ্যাস নিয়ে ভোগান্তিতে আছেন। তারা বলছেন, পেলেও চাপ কম থাকায় রান্না করা যাচ্ছে না। তাদের অভিযোগ, দিনে মাত্র এক-দুই ঘণ্টা গ্যাস পাওয়া যায়, তাও সাধারণত গভীর রাতে বা ভোরে। গ্যাস না পেলেও মাসিক বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে।
রাজধানীর কৃষি মার্কেট ও টাউন হল বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তীব্র গ্যাস-সংকটের কারণে বৈদ্যুতিক চুলা কিনতে মানুষ দোকানে ভিড় করছেন। অনেকে রাইস কুকারও কিনছেন। প্রতিনিয়ত মানুষের ভিড় বাড়ছে। আর নিম্ন আয়ের মানুষেরা বিকল্প হিসেবে মাটির চুলা বেছে নিচ্ছেন।
‘দ্বিগুণ’ দামেও মিলছে না এলপিজি:
বাজারে তরলীকৃত পেট্রলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সরবরাহ ‘সংকট’ থাকায় চরম বিপাকে পড়েছে গ্রাহকরা। সরকার ঘোষিত দামে বাজারে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার মিলছে না। এমনকি ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার হাজার টাকা বেশি গুনেও পাওয়া যাচ্ছে না। এতে প্রতিদিনের বাসাবাড়ি ও হোটেল-রেস্তোরাঁর রান্না নিয়ে মারাত্মক সমস্যা পোহাতে হচ্ছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার চা-দোকানদার আমিনুল বলেন, ‘চায়ের দোকানে সিলিন্ডার গ্যাস আমাদের লাগেই। এই এলাকার কোনো দোকান থেকে সিলিন্ডার কিনতে পারছি না। এক হাজার ৩০০ টাকার সিলিন্ডার এক দোকান থেকে কিনে এনেছি ২৪০০ টাকায়।’
খুচরা বিক্রেতারা দাবি করছে, বাজারে সরবরাহ কম থাকায় চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। অনেক ডিলারের দোকান ফাঁকা।
১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত দাম এক হাজার ৩০৬ টাকা হলেও বাস্তবে সে দামে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি এক হাজার ৩০০ টাকার সিলিন্ডার ‘দ্বিগুণ’ দাম দিয়েও কিনতে পারছেন না গ্রাহকরা। একারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির পাশাপাশি বাড়ছে অসন্তোষ।
কি বলছে বিইআরসি:
শীতের সময় একটু গ্যাসের টান পড়বে এটা আমরা জানি। তাই বলে যে এমন সংকট হবে বলে বিস্ময় প্রকাশ করেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন(বিইআরসি) সদস্য মো. মিজানুর রহমান। তিনি আলোকিত স্বদেশকে বলেন, ‘গ্যাসের বর্তমান সংকটটি বেশ কয়েকদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে। বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। গত চার-পাঁচ দিন আগে আমরা অ্যাসোসিয়েশনকে ডেকেছিলাম তাদের সাথে মিটিং করেছি। ইতিমধ্যে আমাদের যে এলপিজি অপারেটর তাদেরকে আমরা আগামীকাল (আজ) ডেকেছি। আমাদের তাদের নিকট শুনবো তাদের যে এলসি করে মাল আনার লিমিট তারা তা আনছে কি-না।’
‘আমরা আশা করছি এই সংকট দ্রুত কেটে যাবে। আমরা দ্রুত চেষ্টা করছি, আগামীকাল মিটিং করবো, পরশুদিন মিটিং করবো ভালো উপায়গুলো আলোচনা করে কীভাবে এই সংকট কাটানো যায়’, বলে আশা তার।
বিইআরসি ও এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশের (লোয়াব) তথ্যমতে, শীতের সময় বিশ্ববাজারে এলপিজির চাহিদা বেড়ে যায়। এসময় দামও কিছুটা বাড়তি থাকে। এর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে এলপিজি আমদানির জাহাজ সংকট। নিয়মিত এলপিজি পরিবহনের ২৯টি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়েছে। পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। তারপরও চাইলেই জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে আগের মাসের তুলনায় গত ডিসেম্বরে এলপিজি আমদানি কমে গেছে। প্রতি মাসে গড়ে এক লাখ ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টন এলপিজি আমদানি করা হয়। মিজানুর রহমান আরো বলেন, ‘আমাদের নভেম্বর মাসে আমদানি ছিল এক লাখ পাঁচ হাজার টন। ডিসেম্বর মাসে আমাদের আমদানি ছিল এক লাখ ২৬ হাজার টন। ইউএস একটি স্যাংশন দেওয়ার কারণে দুটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর না করে ফিরে গেছে। ওই জাহাজ দুটিতে এলপিজি ছিল।’
শাফিউল আল ইমরান,
সিনিয়র রিপোর্টার










