লন্ডনভিত্তিক দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান-এর এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইরানি বাহিনী বিক্ষোভকারীদের দমনে নজিরবিহীন নৃশংসতা চালাচ্ছে। তেহরানের একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সশস্ত্র বাহিনী বিক্ষোভকারীদের সরাসরি মাথা ও চোখ লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছে। কেবল একটি হাসপাতালেই একদিনে চার শতাধিক আহত ব্যক্তি এসেছেন, যাদের চোখে ও মাথায় গুলির ক্ষত রয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, যারা সরাসরি আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে বিদ্ধ হচ্ছেন তাদের বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না, আর রাবার বুলেটে আহতরা চিরতরে অন্ধ হয়ে যাচ্ছেন। বিক্ষোভের মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে ইরানের ধসে পড়া অর্থনীতিকে। বর্তমানে ইরানি রিয়ালের মান ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে—প্রতি ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫। বছরের পর বছর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির ফলে সৃষ্ট এই মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণকে অসম্ভব করে তুলেছে। গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের ব্যবসায়ীদের ডাকা ধর্মঘট থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এখন ৩১টি প্রদেশের শহর ও গ্রামে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।
বিক্ষোভের শুরু থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। গত মঙ্গলবার তিনি এক বার্তায় ‘শিগগিরই মার্কিন সহায়তা আসছে’ বলে ঘোষণা দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এই আন্দোলনকে ইসরায়েল ও পশ্চিমা বিশ্বের একটি ‘প্রকল্প’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। মিডিলইস্ট আই-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গাজায় ইসরায়েলের চালানো সহিংসতা থেকে বিশ্বের নজর সরাতেই ইরানকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো, বিশেষ করে বিবিসি পার্সিয়ান, বিক্ষোভের তীব্রতাকে অতিরঞ্জিত করে প্রচার করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ইরান সরকার বর্তমানে পুরো দেশে ইন্টারনেট ও মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। সামরিক কর্মকর্তাদের হুঁশিয়ারি—যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে কোনো ধরনের সামরিক হামলা চালায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাবে তেহরান।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এই বিক্ষোভ যেমন বাস্তব সংকটের ফসল, তেমনি এতে মোসাদ ও সিআইএ-র মতো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাবও প্রবল। বৈধ দাবি নিয়ে রাজপথে নামা সাধারণ মানুষ এখন এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি ইরানকে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দিতে পারে।
দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অর্থনৈতিক ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী আন্দোলন এখন গৃহযুদ্ধের রূপ নিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং অভিজাত শাখা ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি) মোতায়েন করেছে তেহরান।
-এম. এইচ. মামুন










