সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অত্যন্ত আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত সাবেক সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযোগ গঠন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজেকে ‘নির্দোষ’ (নট গিল্টি) দাবি করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ দিন জিয়াউলের অব্যাহতি আবেদন খারিজ করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। একইসঙ্গে আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি মামলার সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে।
সকালে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে জিয়াউল আহসানকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। শুনানির শুরুতে বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ আসামির বিরুদ্ধে আনা তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পড়ে শোনান। অভিযোগ পাঠ শেষে ট্রাইব্যুনাল জানতে চান তিনি দোষ স্বীকার করবেন কি না। জবাবে জিয়াউল আহসান দাঁড়িয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘নট গিল্টি’। এরপর আদালত তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে চার্জ গঠন করেন।
প্রসিকিউশন তাদের অভিযোগে জিয়াউল আহসানের পেশাগত জীবনের চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেছে। এতে বলা হয়, ২০০৯ সালে র্যাব-এর গোয়েন্দা বিভাগে যোগদানের পর জিয়াউল আহসান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর এতটাই আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন যে, ২০২৪ সালে বাধ্যতামূলক অবসরের আগ পর্যন্ত ১৫ বছরে তাঁকে আর কখনো মূল বাহিনী তথা সেনাবাহিনীতে ফিরে যেতে হয়নি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, কোনো ব্যাটালিয়ন বা ব্রিগেড কমান্ডের অভিজ্ঞতা এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ছাড়াই তিনি মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন, যা সেনাবাহিনীর ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। মূলত রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবেই তাঁকে একের পর এক পদোন্নতি দেওয়া হয়।
চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম আদালতকে জানান, ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত র্যাবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকাকালীন অসংখ্য গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নায়ক ছিলেন এই জিয়াউল আহসান। সুনির্দিষ্ট তিনটি অভিযোগে বলা হয়েছে:
গাজীপুরের পুবাইলে তিনজনকে সরাসরি উপস্থিত থেকে হত্যা।
বরগুনার পাথরঘাটায় বলেশ্বর নদীর মোহনায় ৫০ জনকে হত্যা।
সুন্দরবনে বনদস্যু দমনের নামে ‘বন্দুকযুদ্ধের নাটক’ সাজিয়ে আরও ৫০ জনকে হত্যা।
এ ছাড়াও তাঁর বিরুদ্ধে আরও তিন শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও হত্যার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন। ট্রাইব্যুনালে আজ রাষ্ট্রপক্ষে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম ও শাইখ মাহদী।
গুম ও খুনের এই বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় জুলাই বিপ্লবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোসহ দীর্ঘদিনের ভুক্তভোগীদের মধ্যে ন্যায়বিচারের নতুন আশা সঞ্চার হয়েছে।