গোপন নথি ফাঁস: গাজা গণহত্যায় ইসরায়েলকে অস্ত্র-অর্থ-গোয়েন্দা দিয়ে সহায়তা করেছে আরব আমিরাত

গাজায় চলমান যুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের ওপর সামরিক অভিযানের শুরু থেকেই ইসরায়েলকে সরাসরি গোয়েন্দা ও লজিস্টিক সহায়তা দিতে নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। সম্প্রতি ‘এমিরেটলিকস’ নামের একটি অনুসন্ধানী প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ফাঁস হওয়া একটি গোপন নথিতে এই বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে।

২০২৩ সালের অক্টোবর মাসের তারিখ সংবলিত ওই নথিতে দেখা যায়, আমিরাতের সশস্ত্র বাহিনীর যৌথ অভিযান কমান্ডের উদ্দেশে এটি লিখেছেন আল-ধাফরা অঞ্চলের প্রতিনিধি হামদান বিন জায়েদ আল-নাহিয়ান। নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, লোহিত সাগর অঞ্চলে আমিরাতের নিয়ন্ত্রণে থাকা সামরিক ঘাঁটিগুলো—বিশেষ করে ইয়েমেনের আল-মোখা, ইরিত্রিয়ার মাসাওয়া ও আসাব এবং সোমালিয়ার ঘাঁটিগুলো ইসরায়েলি বাহিনীকে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। ইয়েমেনের ঘাঁটিগুলোকে ইসরায়েলি বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে সব ধরনের সরঞ্জাম দিয়ে প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

নথিতে দাবি করা হয়েছে, তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবাদ বিরোধী’ যুদ্ধের নামে ইসরায়েলকে প্রায় ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার মূল্যের উন্নত গোয়েন্দা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এতে দুই দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং সামরিক প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ‘সমন্বিত ও ঘনিষ্ঠ’ সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়, গাজায় ‘সন্ত্রাসীরা’ (আন্দোলনকারী গোষ্ঠীগুলো) পুরোপুরি পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত এই সহায়তা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

ফাঁস হওয়া এই নথিতে আমিরাত সরকারের পক্ষ থেকে কাতার ও কুয়েতের কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। হামাসকে সমর্থনের দায়ে কাতারকে অভিযুক্ত করার পাশাপাশি কুয়েতকেও কাতারের সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কুয়েত ও কাতার সম্মিলিতভাবে ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে বলে দাবি করে একে আমিরাতের রাষ্ট্রীয় নীতির ‘স্পষ্ট বিরোধিতা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

২০২০ সালের ‘আব্রাহাম চুক্তি’র পর থেকে ইসরায়েল ও আমিরাতের সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। বর্তমানে আমিরাত ইসরায়েলের বৃহত্তম আরব বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০২৪ সালের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমিরাত-সংযুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইসরায়েলে ১ কোটি ৭১ লাখ ডলারের অস্ত্র রপ্তানি করা হয়েছে, যা সরাসরি গাজায় ব্যবহৃত হয়েছে। এ ছাড়া আমিরাতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা জোট ‘এজ’ ইসরায়েলের শীর্ষ অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রাফায়েলের শেয়ার ধারণ করে বলেও জানা গেছে।

খবর পাওয়া গেছে যে, সাবেক মোসাদ প্রধানের সহ-প্রতিষ্ঠিত সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ‘এক্সএম সাইবার’-এর সঙ্গে আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো চুক্তি করেছে। এর মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি ও তেল খাতের তথ্যের নিয়ন্ত্রণ পরোক্ষভাবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের হাতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এই নথি ফাঁসের ঘটনায় আরব বিশ্বের সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। গাজায় চলমান মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে একটি আরব দেশের পক্ষ থেকে ইসরায়েলকে এমন কৌশলগত ও সামরিক সহায়তা দেওয়ার তথ্যকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

-এম. এইচ. মামুন