প্রতিটি নারীর সাজসজ্জায় চোখ সবসময়ই প্রধান্য পায়। প্রবাদ আছে, চোখ হলো মনের আয়না। আর সেই আয়নাকে আরও মোহনীয় ও আকর্ষণীয় করে তুলতে মেকআপের যে উপকরণটি সবচেয়ে বেশি কার্যকর, তা হলো মাসকারা।
সঠিকভাবে মাসকারা ব্যবহার করলে চোখের পাপড়িগুলো লম্বা, ঘন এবং কালো দেখায়, যা পুরো চেহারায় একটি সজীব ভাব নিয়ে আসে। তবে মাসকারা ব্যবহারের যেমন কিছু বিশেষ কৌশল আছে, তেমনি এর সংরক্ষণেও রয়েছে কিছু সতর্কতা। সঠিক নিয়ম না মেনে মাসকারা ব্যবহার করলে চোখের ক্ষতির পাশাপাশি সাজও মাটি হয়ে যেতে পারে।
মাসকারা ব্যবহারের প্রথম ধাপ হলো চোখের সঠিক প্রস্তুতি। মেকআপ শুরু করার আগে নিশ্চিত করতে হবে যে চোখ পরিষ্কার এবং শুষ্ক আছে। চোখে যদি আগের কোনো মেকআপের অবশিষ্টাংশ বা তেল থাকে, তবে মাসকারা পাপড়িতে ঠিকমতো বসবে না এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তা ছড়িয়ে যেতে পারে। অনেকে সরাসরি মাসকারা ব্যবহার করেন, তবে চাইলে হালকা আইলাইনার বা আইশ্যাডো ব্যবহার করে চোখের বেইজ তৈরি করে নেওয়া যায়। এতে মাসকারার গাঢ় রং আরও বেশি ফুটে ওঠে। মাসকারা লাগানোর ঠিক আগে আইল্যাশ কার্লার দিয়ে পাপড়িগুলো একটু কার্ল করে নিলে চোখ আরও বড় ও খোলা দেখায়।
মাসকারার বোতল খোলা এবং ব্রাশ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা অনেকেই একটি সাধারণ ভুল করি। ব্রাশটি বোতলের ভেতর বারবার ঢোকানো এবং বের করা (পাম্প করা) উচিত নয়। আমরা ভাবি এতে ব্রাশে বেশি মাসকারা লাগবে, কিন্তু আসলে এর ফলে বোতলের ভেতরে বাতাস ঢুকে যায়। এই বাতাসের কারণে মাসকারার লিকুইড দ্রুত শুকিয়ে শক্ত হয়ে যায় এবং ভেতরে ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর সুযোগ পায়। তাই ব্রাশটি বের করার সময় হালকা ঘুরিয়ে বের করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
মাসকারা লাগানোর কৌশলের ওপর নির্ভর করে আপনার চোখ কতটা আকর্ষণীয় দেখাবে। ব্রাশটি পাপড়ির একদম গোড়া থেকে ধরা শুরু করতে হবে। গোড়া থেকে আগার দিকে টেনে নেওয়ার সময় হালকা ‘জিগজ্যাগ’ বা আঁকাবাঁকা মোশনে ব্রাশটি চালালে প্রতিটি পাপড়ি আলাদা হয়ে যায় এবং মাসকারা সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এতে পাপড়িগুলো একটির সাথে অন্যটি লেগে যায় না। একবারে খুব বেশি মাসকারা না লাগিয়ে দুই থেকে তিন স্তরে (Coats) লাগানো ভালো। প্রথম স্তরটি শুকানোর জন্য কয়েক সেকেন্ড সময় দিন, তারপর দ্বিতীয় স্তরটি লাগান। এতে পাপড়িগুলো অনেক বেশি ঘন ও প্রাকৃতিকভাবে সুন্দর দেখাবে।
উপরের পাপড়ির পাশাপাশি নিচের পাপড়িতেও মাসকারা লাগানো প্রয়োজন, তবে এখানে খুব সতর্ক থাকতে হয়। নিচের পাপড়ি সাধারণত ছোট ও পাতলা হয়, তাই খুব সামান্য পরিমাণে মাসকারা ব্যবহার করাই যথেষ্ট। বেশি মাসকারা দিলে তা চোখের নিচে লেগে কালচে ছোপ তৈরি করতে পারে, যা সাজকে অগোছালো দেখায়। মাসকারা লাগাতে গিয়ে যদি ভুলবশত চোখের আশেপাশে লেগে যায়, তবে সাথে সাথে মুছতে যাবেন না। মাসকারাটি শুকানোর জন্য অপেক্ষা করুন, তারপর একটি কটন বাড দিয়ে আলতো করে মুছে ফেলুন। ভেজা অবস্থায় মুছতে গেলে তা আরও বেশি ছড়িয়ে যাওয়ার ভয় থাকে।
মাসকারা দিয়ে সাজগোজ করা যতটা আনন্দের, দিনশেষে তা তুলে ফেলা ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। মাসকারা লাগিয়ে ঘুমিয়ে পড়া চোখের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটি পাপড়িকে শক্ত করে দেয়, যার ফলে ঘুমের মধ্যে ঘষা লেগে পাপড়ি ভেঙে যেতে পারে। এছাড়া দীর্ঘক্ষণ মাসকারা থাকলে চোখে সংক্রমণ বা অ্যালার্জির ঝুঁকি বেড়ে যায়। ওয়াটারপ্রুফ মাসকারা সাধারণ পানি দিয়ে ওঠে না, তাই ভালো মানের মেকআপ রিমুভার, মাইসেলার ওয়াটার বা ঘরোয়া উপায়ে নারকেল তেল ব্যবহার করা যেতে পারে। তুলায় সামান্য তেল বা রিমুভার নিয়ে চোখের ওপর কয়েক সেকেন্ড চেপে ধরে রেখে আলতো করে মুছে ফেললে মাসকারা সহজেই পরিষ্কার হয়ে যায়।
মাসকারার মেয়াদের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত। সাধারণত মাসকারার মেয়াদ তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত থাকে। মেয়াদোত্তীর্ণ মাসকারা ব্যবহার করলে চোখে চুলকানি, লাল ভাব বা মারাত্মক ইনফেকশন হতে পারে। যদি মাসকারা থেকে কোনো বাজে গন্ধ আসে বা এর ঘনত্ব পরিবর্তন হয়ে দলা পাকিয়ে যায়, তবে তা দ্রুত ফেলে দেওয়া উচিত। চোখের মতো সংবেদনশীল অঙ্গের সুরক্ষায় কোনোভাবেই পুরনো কসমেটিকস ব্যবহার করা ঠিক নয়।
মাসকারা কেবল একটি প্রসাধনী নয়, এটি চোখের ভাষা বদলে দেওয়ার একটি জাদুকরী সরঞ্জাম। সঠিক নিয়ম মেনে এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে মাসকারা ব্যবহার করলে আপনার চোখ হয়ে উঠবে আরও প্রাণবন্ত ও আত্মবিশ্বাসী। সুন্দর চোখের মায়ায় নিজেকে অনন্য করে তুলতে মাসকারার এই ছোট ছোট কৌশলগুলো মেনে চলা প্রতিটি সচেতন নারীর জন্য অপরিহার্য।
বিথী রানী মণ্ডল/










