চলতি অর্থবছরের জন্য সরকারের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি)। মূল এডিপির তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কমিয়ে সংশোধিত এডিপির মোট আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ কোটি টাকা। এতে বরাদ্দ কমেছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা।
সোমবার শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এই সংশোধিত এডিপি অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, সংশোধিত এডিপিতে সরকারি অর্থায়ন ও বিদেশি ঋণ-অনুদান উভয় খাতেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বরাদ্দ কমানো হয়েছে। সরকারি অর্থায়নের অংশে বরাদ্দ কমেছে ১৬ হাজার কোটি টাকা, যা মূল বরাদ্দের প্রায় ১১ শতাংশ। আর বিদেশি ঋণ ও অনুদান খাতে কাটছাঁট হয়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকা, যা মূল বরাদ্দের তুলনায় ১৬ শতাংশের বেশি।
এর ফলে সরকারি অর্থায়ন নেমে এসেছে ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকায় এবং বিদেশি ঋণ ও অনুদান দাঁড়িয়েছে ৭২ হাজার কোটি টাকায়।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, সংশোধিত এডিপি প্রণয়নের সময় মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর বরাদ্দ চাহিদা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। তারা মোট বরাদ্দ চেয়েছিল প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি, দীর্ঘদিন প্রকল্প পরিচালক না থাকা, নতুন পরিচালক নিয়োগে বিলম্ব এবং বড় কয়েকটি প্রকল্প পুনর্মূল্যায়নের আওতায় থাকায় ব্যয় কম চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচন বছর হওয়ায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোও রক্ষণশীল অবস্থান নিয়েছে।
খাতভিত্তিক বরাদ্দে সংশোধিত এডিপিতে সর্বোচ্চ অর্থ পেয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত। এই খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৮ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির প্রায় ২০ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত—২৬ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা। এছাড়া বাসস্থান ও কমিউনিটি সুবিধা, শিক্ষা এবং স্থানীয় সরকার ও গ্রামীণ উন্নয়ন খাতেও উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
তবে সংশোধিত এডিপিতে সবচেয়ে বেশি কাটছাঁট করা হয়েছে স্বাস্থ্য খাতে। দুর্বল বাস্তবায়ন সক্ষমতার কারণে এই খাতে বরাদ্দ প্রায় ৭৪ শতাংশ কমানো হয়েছে। মূল এডিপিতে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা, যা সংশোধনের পর কমে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭১৮ কোটি টাকায়। শিক্ষা খাতেও বরাদ্দ কমেছে প্রায় ৩৫ শতাংশ।
পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে মূল এডিপিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ থাকলেও সংশোধিত এডিপিতে এই খাতেও প্রায় ৩৫ শতাংশ অর্থ কমানো হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ নেমে এসেছে উল্লেখযোগ্যভাবে—২ হাজার ১৮ কোটি টাকা থেকে কমে হয়েছে ৫৪৫ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ এবং কৃষি খাতে কমেছে প্রায় ২১ শতাংশ।
তবে পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও পানি সম্পদ খাতে ব্যতিক্রমীভাবে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। সংশোধিত এডিপিতে এই খাতে প্রায় ২০ শতাংশ অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় ও বিভাগভিত্তিক বরাদ্দে সবচেয়ে বেশি অর্থ পেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ—৩৭ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা, যদিও এটি মূল এডিপির তুলনায় কিছুটা কম। এরপর রয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং বিদ্যুৎ বিভাগ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোও উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ পেয়েছে।
সংশোধিত এডিপিতে বিশেষ উন্নয়ন সহায়তা খাতের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও করপোরেশনগুলোর নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলো যুক্ত করলে মোট সংশোধিত এডিপির আকার দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা।
এই সংশোধিত এডিপিতে মোট ১ হাজার ৩৩০টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরে ২৮৬টি প্রকল্প সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে পরিকল্পনা কমিশন।
আফরিনা সুলতানা/










