সুদের হার কমানো কোনো সহজ বা একক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনীতির ভারসাম্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে— এমন মন্তব্য করেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ব্যাংকিং অ্যালমানাকের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ব্যাংকিং অ্যালমানাকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, অনেক সময় সুদের হার কমানোর বিষয়টি সহজ সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু বাস্তবে সুদ কমালে অর্থনীতির অন্য খাতে চাপ তৈরি হতে পারে। ট্রেজারি বিল, ব্যাংকিং খাত ও বাজার ব্যবস্থার মধ্যে যথাযথ সমন্বয় ছাড়া সুদের হার কমানো হলে এর বিরূপ প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, ট্রেজারি বিলের সুদহার ইতোমধ্যে কমেছে এবং এর প্রভাব ধীরে ধীরে বাজারে প্রতিফলিত হবে। তবে ট্রেজারি বিল বা সঞ্চয়পত্রের সুদ বাড়ালে ব্যাংকে আমানত কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংক খাতের প্রধান দায়িত্ব হলো সঞ্চয় ও ঋণের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা। ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে। এই কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়লে পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ব্যাংকিং অ্যালমানাক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি সরাসরি বিনিয়োগ নির্দেশনা না দিলেও ব্যাংক খাত বিশ্লেষণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভাণ্ডার। এতে পেইড-আপ ক্যাপিটাল, অথরাইজড ক্যাপিটাল, ক্যাপিটাল রেশিও, প্রভিশনিং, রিটেইন্ড আর্নিংস ও ক্রেডিট-ডিপোজিট রেশিওসহ প্রয়োজনীয় নানা তথ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানান, নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও ব্যাংকিং অ্যালমানাক নিয়মিত প্রকাশ করা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় খাতটি সংকটের মধ্যে ছিল। তবে সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, কিছু ব্যাংকের প্রভিশনিং ও ঋণ কার্যক্রমে ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলছে, যা ব্যাংকিং অ্যালমানাকেও প্রতিফলিত হয়েছে।
মুদ্রাস্ফীতি প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, বাজার তদারকি এবং ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের সম্মিলিত সহযোগিতা ছাড়া টেকসই সমাধান পাওয়া যাবে না।
এ সময় তিনি গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশকে সবসময় নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন না করে ইতিবাচক অর্জনগুলো তুলে ধরা এবং গঠনমূলক সমালোচনা করা জরুরি। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অর্থ উপদেষ্টা আরও বলেন, বাংলাদেশকে হুবহু সিঙ্গাপুরে রূপান্তরের স্বপ্ন দেখানো নয়; বরং ধৈর্য, চেষ্টা ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য। জনপ্রিয়তার চাপ নয়, বরং দেশের সামগ্রিক স্বার্থ বিবেচনা করেই নীতিনির্ধারণ করতে হয়। নীতিগত সিদ্ধান্তে সবাইকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয় এবং ভুলের সম্ভাবনাও থাকে। তিনি বলেন, জনপ্রিয় বা পপুলিস্ট দাবির চাপে পড়ে সুদ বা কর কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়, কারণ নীতি একজনের জন্য নয়, পুরো দেশের কল্যাণের জন্যই প্রণয়ন করা হয়।
আফরিনা সুলতানা/










