ঠিক এই মুহূর্তে শাহরুখ খান নিশ্চয়ই চাননি, তার সিনেমার গল্প বাস্তব জীবনে এতটা নির্মমভাবে ফিরে আসুক। ‘চাক দে! ইন্ডিয়া’ ছবিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ পেনাল্টি মিস করার পর হকি খেলোয়াড় কবির খানকে সমাজচ্যুত করা হয়েছিল, বাড়ির দেয়ালে কয়লা দিয়ে লেখা হয়েছিল‘গাদ্দার’। বহু বছর পর বাস্তব জীবনেও যেন সেই গল্পই নতুন করে লেখা হলো।
ভাগ্য ভালো, মুম্বাইয়ের মান্নাতের দেয়ালগুলো এখনো সাদা। তবে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) ফ্র্যাঞ্চাইজি বাংলাদেশের পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে দলে নেওয়ায় এক কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতা ও রাজনীতিক শাহরুখ খানকে প্রকাশ্যে ‘গাদ্দার’ আখ্যা দিয়েছেন।
আজকাল খেলাধুলা বা বিনোদন সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা না থাকলেও অনেকেই টিভির পর্দা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বিশেষজ্ঞ’ হয়ে উঠছেন। আইপিএল নিলামের নিয়ম না জেনেও, ক্রিকেটে শাহরুখ খানের প্রকৃত ভূমিকা না বুঝেও দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করে যাচ্ছেন—এবং তাতেই পার পেয়ে যাচ্ছেন।
যারা ভেতরের খবর জানেন, তাদের মতে ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্তে শাহরুখ খান প্রায় কখনোই নাক গলান না। তিনি নিজেই বহুবার বলেছেন, যেভাবে তিনি কোনো ক্রিকেটারের কাছ থেকে অভিনয়ের পরামর্শ নেবেন না, তেমনি ক্রিকেটের টেকনিক্যাল বিষয়ে কোথায় থামতে হয়, সেটাও তিনি ভালোই জানেন।
শোনা যায়, নিলামের আগে দিনে সর্বোচ্চ ১০ মিনিটের বেশি দলের সঙ্গে থাকেন না কেকেআরের মালিক। সেটিও মূলত সৌজন্য সাক্ষাৎ, হালকা আড্ডা ও মন ভালো করার জন্য। গৌতম গম্ভীর—যার সঙ্গে শাহরুখের সম্পর্ক সবচেয়ে দীর্ঘ—একবার বলেছিলেন, সাত বছরে ক্রিকেট নিয়ে তাদের কথাবার্তা হয়েছে মোটে ৭০ সেকেন্ডের মতো।
শাহরুখ খানের ক্রিকেটের প্রতি দায়বদ্ধতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যায় চেতেশ্বর পুজারার গল্পে। ২০০৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় আইপিএল খেলতে গিয়ে গুরুতর হ্যামস্ট্রিং চোটে পড়েন তরুণ পুজারা। দেশে ফিরতে চাইছিলেন তিনি। তখন শাহরুখ নিজ উদ্যোগে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় অস্ত্রোপচার করান এবং প্রয়োজনে পুজারার বাবা ও চিকিৎসককে সেখানে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও করেন। পুজারার বাবা আজও সেই সহায়তার কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।
পরবর্তীতে পুজারা কেকেআরের তারকা না হলেও ভারত পেয়েছে এক বিশ্বমানের টেস্ট ব্যাটসম্যান—অস্ট্রেলিয়ায় ঐতিহাসিক সিরিজ জয়ের অন্যতম নায়ক। সেই গল্পেও আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয় শাহরুখ খানের নাম।
কেকেআরের হয়ে খেলা প্রায় প্রতিটি ক্রিকেটারেরই আছে একটি করে ‘শাহরুখ গল্প’—ভদ্রতা, ব্যক্তিগত যত্ন আর বিনয়ের গল্প। কোনোদিন নির্দিষ্ট দেশ বা ধর্মের প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগ ওঠেনি। আইপিএলের প্রথম শিরোপাজয়ী ম্যাচে ম্যাচজয়ী ইনিংস খেলা মানভিন্দর বিসলা বলেছিলেন, “ভালো খেললে সবাই পাশে দাঁড়ায়। কিন্তু খারাপ সময়ে যে সম্মান দেয়, সেই মানুষকে আলাদা করে মনে থাকে।” শাহরুখ ঠিক তেমনই।
মুস্তাফিজুর রহমানকে দলে নেওয়ার ক্রিকেটীয় যুক্তিটাও স্পষ্ট। বিসলার ভাষায়, “মিনি নিলাম মূলত ব্যাকআপ নেওয়ার জায়গা। কেকেআরের পাওয়ার প্লে ও ডেথ ওভারে বোলার দরকার ছিল। মুস্তাফিজ ছিল একদম পারফেক্ট পছন্দ।”
ক্রিকেটীয় বাস্তবতা যতই স্পষ্ট হোক, বাস্তব জীবনে আবারও যেন সিনেমার মতোই এক নায়ককে ‘গাদ্দার’ বানানোর চেষ্টা চলছে। তবে ইতিহাস বলে—সময়ই শেষ পর্যন্ত সত্যের পক্ষে কথা বলে।
– এমইউএম










