ইরানে চলমান নজিরবিহীন গণবিক্ষোভের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সরাসরি উসকানিকে দায়ী করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি। শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) লেবানন সফরকালে এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, বিদেশি শক্তিগুলো সাধারণ মানুষের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সহিংসতায় রূপান্তরের চেষ্টা করছে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক হামলার হুমকিকে উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ইরানে সরাসরি সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।
গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা এখন ইরানের ৩১টি প্রদেশেই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি (প্রায় ৫২.৬%) এবং রিয়ালের রেকর্ড দরপতনের ফলে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া সাধারণ মানুষ এখন সরাসরি সরকারবিরোধী স্লোগান দিচ্ছে।
বিক্ষোভ দমনে গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, গত ১৩ দিনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নিহতের সংখ্যা অন্তত ২০০ ছাড়িয়েছে, যদিও ইরানি কর্তৃপক্ষ এই সংখ্যার সত্যতা অস্বীকার করেছে।
ইরানের এই অস্থিরতার মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চতুর্থবারের মতো তেহরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে লিখেছেন, “ইরান বড় বিপদে আছে। যদি তারা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসবে। আমরা এখন ‘লকড অ্যান্ড লোডেড’ অবস্থায় আছি।”
এর আগে গত জুন মাসে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প সতর্ক করেন যে, এবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, উদ্ধার অভিযানের অর্থ এই নয় যে মার্কিন সেনারা সরাসরি ইরানের মাটিতে নামবে; বরং দূরপাল্লার হামলা বা ড্রোন অভিযানের ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
ট্রাম্পের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবের বিপরীতে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের সমর্থন দিয়ে প্রমাণ করেছে যে তারাই এই বিশৃঙ্খলার নাটের গুরু। তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে বিভাজন ও সহিংসতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।” মার্কিন সামরিক অভিযান প্রসঙ্গে তিনি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, “আগেও তারা এমন চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। ইরানের সার্বভৌমত্বে আঘাত করার সাহস তাদের হবে না।”
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে চুপ থাকলেও গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের অভ্যন্তরীণ এই অস্থিরতা দেশটির আঞ্চলিক প্রভাব ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে দুর্বল করে দেবে।
বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন স্থানে সরকারি টেলিভিশন ভবন (IRIB) ও প্রশাসনিক কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। রাজধানী তেহরানসহ বড় শহরগুলোতে প্রচুর সাঁজোয়া যান ও দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তবে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ইরানের ভেতরের প্রকৃত চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছাতে সময় লাগছে।
এম. এইচ. মামুন










