নদী, পাহাড় আর প্রকৃতির প্রতি আমার টান ছোটবেলা থেকেই শুরু। শহরের ব্যস্ততা, কৃত্রিম আলো আর যান্ত্রিক জীবনের ভিড়ে কখনও কখনও আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলি। সেই সব মুহূর্তে যখন শহরের কোলাহল থেকে দূরে যাই, প্রকৃতির কোলে ফিরে আমার মনে হয় আমি আবার নতুন করে জীবনকে অনুভব করছি। ক্যামেরার সামনে যত চরিত্রেই অভিনয় করি না কেন, প্রকৃতির কাছে ফিরে আমি শুধু তৌসিফ মাহবুব—কোনো অভিনয় নেই, কোনো সংলাপ নেই, শুধুই নিজের উপস্থিতি।
নদীর ধারে বসে থাকা আমার জন্য এক ধরনের ধ্যান। বহমান পানির শব্দ আমাকে শেখায়, সময় থেমে থাকে না, জীবনও নদীর মতোই ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে। শুটিংয়ের ফাঁকে যখনই সুযোগ পাই, নদীর কাছে চলে যাই। কখনো একা, কখনো কাছের মানুষদের সঙ্গে। নদীর নীরবতা, পানির ছোঁয়া এবং বাতাসের শব্দ—সবই আমাকে শান্তি দেয়। একইভাবে পাহাড়ও আমাকে টানে ভিন্নভাবে। পাহাড়ের নীরবতা, দৃঢ়তা এবং বিশালতা আমাকে নিজের সীমাবদ্ধতা বোঝায়। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়ালে মনে হয়, জীবনের অনেক সমস্যা বাস্তবে খুব ছোট। এমন সময় মনে হয়, আমি প্রকৃতির সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে গেছি।
প্রকৃতি আমার অভিনয়ের শক্তিও বাড়িয়ে দেয়। নদী-পাহাড়ে সময় কাটালে ভেতরের ক্লান্তি ঝরে যায়, নতুন চরিত্রে ঢোকার শক্তি পাই। চরিত্রের মানসিক অবস্থা প্রায়ই প্রকৃতি থেকেই অনুপ্রেরণা পায়। কখনও নদীর মতো শান্ত, কখনও পাহাড়ের মতো দৃঢ়। এই প্রাকৃতিক অভিজ্ঞতা আমার অভিনয়ের ভেতর গভীরতা আনে। ছোটপর্দার কাজ আমাকে পরিচিতি দিয়েছে, জনপ্রিয়তা দিয়েছে, কিন্তু প্রকৃতি আমাকে ভারসাম্য দিয়েছে। সেই ভারসাম্য না থাকলে হয়তো অভিনয় এতটা প্রাঞ্জল ও গভীর হতো না। তাই সুযোগ পেলেই শহর ছেড়ে প্রকৃতির কাছে ছুটে যাই।
আমার বিশ্বাস, নদী, পাহাড় এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কটা শুধু ভ্রমণের নয়; এটি নিজের সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়ার এক পথ। গ্রামের ছোট পথ, কাঁচা রাস্তা, ভেজা মাটি, নীল আকাশ—সবকিছু মনে করিয়ে দেয় আমি কোথা থেকে এসেছি। শহরের কোলাহলে বা ব্যস্ততার ভেতর আমি যতই হারাই না কেন, এই প্রকৃতির উপস্থিতি আমাকে মাটির সঙ্গে সংযুক্ত রাখে। দর্শকের ভালোবাসা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নিজের ভেতরের শান্তিটাও জরুরি। প্রকৃতি সেই শান্তির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ঠিকানা।
গত বছরের শেষের দিকে শুটিংয়ের ফাঁকে আমি প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটিয়েছি। নদী-পাহাড়ের সেই মুহূর্তগুলো সামাজিক মাধ্যমে ভাগ করেছি। ফিরে এসে আবার নতুন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। তবে আমি জানি, ফুরসত পেলেই আবার দূরে কোথাও ছুটে যাব। প্রকৃতি আমাকে পুনর্জীবিত করে, আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় জীবনের আসল মানে। নদী, পাহাড় এবং প্রকৃতির কোলে কাটানো সময় শুধুই বিশ্রাম নয়, এটি আমার আত্মার খোরাক। তাই যতই ব্যস্ত হই, এই ডাক আমি কখনো উপেক্ষা করতে পারি না। প্রকৃতির এই টানই আমাকে ভারসাম্য, শক্তি এবং নতুন উদ্দীপনা দেয়—অভিনয় হোক বা জীবনের যেকোনো মুহূর্ত, তার জন্য আমি চিরকাল কৃতজ্ঞ।
-বিথী রানী মণ্ডল










