বাংলাদেশ সিদ্ধান্তে অনড়, ভারতে বিশ্বকাপ খেলবে না

মামুন হোসেন

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালটি শুরু হলো এক নজিরবিহীন নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে। আগামী ফেব্রুয়ারি-মার্চে ভারতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তে অনড় অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ। রাজনৈতিক টানাপোড়েন, নিরাপত্তাজনিত শঙ্কা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবনতি—এই ত্রিমাত্রিক সংকটের জের ধরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের জাতীয় দল ভারতে সফরে যাবে না।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সবুজ সংকেত না পাওয়া এবং ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে ক্রীড়া উপদেষ্টা নিশ্চিত করেছেন।

বাংলাদেশের এই কঠোর অবস্থানের পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে গত কয়েক মাসের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সীমান্ত উত্তেজনা। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছিল, তা ২০২৬ সালের শুরুতে এসে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বিসিবি সভাপতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমরা আমাদের খেলোয়াড়দের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোনো টুর্নামেন্টে পাঠাতে পারি না। বর্তমান ভারতে যে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছে, তাতে আমাদের ক্রিকেটারদের পূর্ণ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা আমরা পাইনি। আইসিসি নিরাপত্তার আশ্বাস দিলেও আমরা আমাদের নিজস্ব গোয়েন্দা রিপোর্ট এবং সরকারের পরামর্শকে গুরুত্ব দিচ্ছি।”

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে বাংলাদেশের টিম যাবে কি না এ বিষয়ে পরামর্শ করতে বুধবার সচিবালয়ে যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সঙ্গে দেখা করতে যান বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি, সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলসহ বোর্ডের পরিচালকরা।

বাংলাদেশের অবস্থান আইসিসিকে বোঝাতে সক্ষম হবেন বলে আশা প্রকাশ করে আসিফ নজরুল বলেন, “আমাদের ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা, বাংলাদেশের নিরাপত্তা, বাংলাদেশের মর্যাদা- এটার প্রশ্নে আমরা কোনো আপস করব না। আমরা ক্রিকেট খেলতে চাই, আমরা বিশ্বকাপ খেলতে চাই। আরেকটি যে আয়োজক দেশ আছে শ্রীলঙ্কা, আমরা সেখানে খেলতে চাই।

“এই পজিশনে (ভারতে খেলতে না যাওয়া) আমরা অনড় আছি। আমরা কেন অনড় আছি, আমরা আশা করি সেটা আইসিসিকে বোঝাতে সক্ষম হব। আইসিসি আমাদের যুক্তিগুলো হৃদ্যতার সঙ্গে নিরপেক্ষভাবে বিবেচনা করে আমরা কষ্ট করে যেটা অর্জন করেছি সেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আমাদের খেলার সুযোগ করে দেবে।”

সবকিছুর সূত্রপাত ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া নিয়ে। কিছুদিন ধরেই ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে খবর উঠে আসছিল, বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংস নানা ঘটনার পর ভারতে ক্ষোভ দানা বাঁধছে। মুস্তাফিজের আইপিলে খেলতে দেওয়া নিয়েও নানা বিতর্ক চলছিল।

এসবের জের ধরে গত শনিবার ভারতীয় বোর্ডের সচিব দেবাজিৎ সাইকিয়া জানান, বাংলাদেশের পেসারকে বাদ দিতে কলকাতা নাইট রাইডার্সকে নির্দেশ দিয়েছেন তারা। এর পরপরই কলকাতা দল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়, ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে দলে নেওয়া পেসারকে তারা ছেড়ে দিয়েছে।

মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় বাংলাদেশে। শনিবার রাতেই ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ফেসবুকে পোস্টে লেখেন, বিশ্বকাপ খেলতে বাংলাদেশ দলের ভারতে যাওয়া তিনি নিরাপদ মনে করছেন না। বাংলাদেশে আইপিএলের সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টাকে অনুরোধ করেন ওই পোস্টে।

এরপর পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে আইপিএলের সকল খেলা ও অনুষ্ঠান সম্প্রচার বন্ধ রাখতে সোমবার নির্দেশ আসে তথ্য মন্ত্রণালায়ের তরফ থেকে।

নিরাপত্তা শঙ্কায় ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে দল না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি)। পরদিন আইসিসির কাছে চিঠি পাঠিয়ে বিসিবি জানায়, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় আগামী মাসের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাবে না তারা। বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারতের বাইরে নেওয়ার অনুরোধ করা হয় সেই চিঠিতে।

বাংলাদেশ প্রথম থেকেই দাবি জানিয়ে আসছিল যে, ভারতের পরিবর্তে এই বিশ্বকাপ কোনো নিরপেক্ষ ভেন্যুতে (যেমন: সংযুক্ত আরব আমিরাত বা শ্রীলঙ্কা) আয়োজন করা হোক। এর আগে ২০২৪ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে আরব আমিরাতে নেওয়া হয়েছিল পরিস্থিতির কারণে। বিসিবি সেই নজির টেনে এবারও ভেন্যু পরিবর্তনের দাবি জানায়।

তবে ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই) এবং আইসিসি এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। আইসিসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভারত একটি নিরাপদ দেশ এবং সব দলের জন্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে; কিন্তু পাকিস্তান ও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভিন্নমত আসায় টুর্নামেন্টটি আয়োজনের ভবিষ্যৎ নিয়ে একধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

বিসিবির এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় হারভাজান সিং বলেছেন, ভারত সব দলকে আতিথেয়তা দিতে প্রস্তুত। দেশটির সাবেক এই স্পিনারের মতে, ভারতে খেলতে যাওয়া না-যাওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশেরই।

আইপিএল থেকে মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়া নিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, “আমার কাছে মনে হয়েছে, এটা কেবল নিরাপত্তাই না, জাতীয় অবমাননার ইস্যু। আমরা নিরাপত্তার ইস্যুকে মুখ্য করে দেখছি। ভারতের ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড নিজেরাই বলছে কলকাতাকে যে এই ক্রিকেটারকে নিরাপত্তা দেওয়া যাচ্ছে না। তাকে আপনাদের টিম থেকে বাদ দেন।

“এটিই একটি ট্যাসিট রিকগনিশন যে ভারতে নিরাপদে খেলার পরিবেশ নেই। ভারতের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির বিগার পিকচার নিয়ে কিছু বলতে চাচ্ছি না। কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটের নিরাপত্তা ও মর্যাদা, সেই প্রশ্নে আমরা কোনো আপস করব না।”

“কিন্তু আমরা অবশ্যই ক্রিকেট বিশ্বকাপ খেলতে চাই। পরবর্তী পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আবারও বসে আমরা সিদ্ধান্ত নেব। এখন পর্যন্ত আমরা এই সিদ্ধান্ত ক্লিয়ারলি নিয়েছি যে, আমরা আইসিসিকে বোঝাব যে আমাদের ভারতে খেলার মতো পরিবেশ নেই।”

আইসিসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে কবে জানানো হবে জানতে চাইলে আসিফ নজরুল বলেন, “আজ রাত কিংবা কাল সকালের মধ্যে বলে দেওয়া হবে। নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়ে আমরা আইসিসিকে আমরা প্রথমে লিখেছিলাম, খেলোয়াড়দের দেখার স্কোপ আমাদের আছে।

“কিন্তু খেলোয়াড়দের বাইরে যে একটি বড় জনগোষ্ঠী আছে, আমাদের সাংবাদিক, ক্রিকেট স্পনসররা আছেন, ক্রিকেট ভক্তরা আছেন, তারা খেলা দেখতে যাবেন, এ জন্য আমরা সরকারের পরামর্শ দিচ্ছি। কারণ, বিদেশ ভ্রমণে যাওয়ার সময় আমাদের সরকারের অর্ডার লাগে। সেই বিষয়ে আমরা জানতে এসেছিলাম।”

বৈঠক শেষে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল বলেন, “নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিতের অধিকার আমরা লড়াই করে যাব। এর আগে অনেকগুলো বিশ্বকাপ খেলেছি, কখনো আমরা এমন কথা বলিনি। এবার যৌক্তিক কারণ আছে বলেই আমরা বলেছি।

“আশা করছি, আইসিসির কাছে আমরা আমাদের যুক্তি বোঝাতে পারবো। ভারত একটি খেলোয়াড়কে নিরাপত্তা দিতে পারছে না, সেখানে পুরো ক্রিকেট টিম ও সংশ্লিষ্টদের কীভাবে তারা নিরাপত্তা দেবেন—সেই প্রশ্ন রয়ে গেছে।”

আইসিসির পূর্ণ সদস্য হিসেবে আইসিসি ফিউচার ট্যুর প্রোগ্রাম এবং বিশ্বকাপের মতো ইভেন্টে অংশ নেওয়া বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশ যদি শেষ পর্যন্ত নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থাকে, তবে আইসিসি তাদের ওপর বড় ধরনের আর্থিক জরিমানা এবং পয়েন্ট কর্তন করতে পারে। এমনকি ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে।

ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ যদি যৌক্তিক কারণ দেখাতে ব্যর্থ হয়, তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বিসিবি মনে করছে, নিরাপত্তার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে জড়িত, তাই তারা আইনি লড়াইয়ে নামতে প্রস্তুত।

বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ক্রিকেট দল বাংলাদেশ। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে বাংলাদেশের বিশাল দর্শক সমর্থক রয়েছে। বাংলাদেশ না খেললে ব্রডকাস্টিং রেভিনিউ এবং টিকিট বিক্রিতে বড় ধরনের ধাক্কা খাবে আইসিসি।

অন্যদিকে, ভারত এই সিদ্ধান্তকে ‘রাজনৈতিক চাল’ হিসেবে অভিহিত করেছে। বিসিসিআই-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভারত সরকার যেকোনো আন্তর্জাতিক দলকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্তকে তারা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও তিক্ত করার পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে।

বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তদের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘#NoCricketInIndia’ এবং ‘#StandWithBCB’ হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ডিং হচ্ছে। বড় একটি অংশ মনে করছে, দেশের সম্মান ও নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস করা উচিত নয়। অন্যদিকে, ক্রিকেট পাগল দর্শকদের একটি অংশ এই ভেবে মনঃক্ষুণ্ন যে, ভারতের মাটিতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের হারিয়ে জয়ের উল্লাস দেখা থেকে তারা বঞ্চিত হবে।

পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, আইসিসি এখন মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে দুবাইতে আইসিসির একটি জরুরি বোর্ড মিটিং অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে বাংলাদেশকে কোনো বিশেষ নিরাপত্তা প্রটোকল বা নির্দিষ্ট কয়েকটি ভেন্যুতে খেলার প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। তবে বিসিবি স্পষ্ট করেছে, ভারতের মূল ভূখণ্ডে তারা পা রাখবে না।

বাংলাদেশ যদি ভারতে গিয়ে খেলতে না চায়, সেক্ষেত্রে যদি এই বিশ্বকাপটিতেই ছাড় দিতে হয়, তাহলে কী করা হবে জানতে চাইলে বুলবুল বলেন, “বিসিবি সেটাও বিবেচনা করবে। যখন চ্যাম্পিয়নস ট্রফি হয়েছিল, তখন পাকিস্তানে যায়নি ভারত, গত কয়েকটি বিশ্বকাপ খেলতে পাকিস্তানও ভারত যায়নি। আমরাও আশা করছি, একটি সঠিক জবাব পাব।”