নির্বাচন কমিশনকেও গণভোটের প্রচারে মাঠে নামতে হবে: উপদেষ্টা সাখাওয়াত

 

বুধবার (৭ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর তোপখানা রোডে অবস্থিত সিরডাপের এ টি এম শামসুল হক মিলনায়তনে এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) আয়োজনে ‘গণভোট: ২০২৬: কী ও কেন?’ শীর্ষক এই বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন তিনি।

বৈঠকে এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো আগের মতোই চলতে চায়, নাকি পরিবর্তন হতে চাইছে-এটা শোনা যাচ্ছে না। যেসব বড় দল ক্ষমতায় যাবে বলে মনে হচ্ছে, তাদের মুখেও সে ধরনের অঙ্গীকার শোনা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের একটা বিশাল বিপর্যয় আমরা প্রত্যক্ষ করলাম। একটা প্রতাপশালী সরকার (ক্ষমাতচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার) তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। রাষ্ট্রীয় কাঠামো, সমাজ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সব ভেঙে পড়েছে। সবকিছু একটা ইল্যুশনের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। সে সময় কেউ ব্যতিক্রমধর্মী কোনো কথা বললে গুম, খুন, জেল, নাহয় সামাজিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হতো।

তিনি বলেন, ‘এখন আমরা কী চাইছি? সেই অবস্থাতে ফিরতে চাচ্ছি? গণতন্ত্রের কথা বলে আমরা একনায়কতন্ত্রের দিকে যাচ্ছি কি না, ফ্যাসিবাদ দেখব কি না, ভোটবাক্স ক্যাপচার (দখল) হবে কি না, মন্ত্রণালয়কে পরিকল্পনা ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হবে কি না…?’

আগের মতো অবস্থা না চাইলে ব্যবস্থা বদলাতে হবে বলে মন্তব্য করে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সে জন্য গণভোটে সংস্কারের বিষয়গুলো জরুরি। কিন্তু এটা হবে কীভাবে? এটা নির্ভর করবে প্রথমত ভোটারদের ওপর। নির্বাচনের সময় বাকি এক মাস। গণভোট নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে প্রচার যতটুকু হচ্ছে, ততটুকুই দেখা যাচ্ছে।

২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে মাঠপর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, ‘এটা (গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে প্রচার) নির্বাচন কমিশনেরও দায়িত্ব। এবার নির্বাচন কমিশনের কাজ ভোটের পাশাপাশি গণভোট কী, সেটা জনগণকে বলা। ইসিকে অনুরোধ করব, আপনারা মবিলাইজ করুন; শুধু ভোট নয়, গণভোট কীভাবে হবে সেটা জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করুন, প্রয়োজনে অন্যদের সহযোগিতা নিন। এই কাজটা শুধু সরকার করতে গেলে অনেক কথা উঠবে।’

নাগরিক সংগঠনগুলোরও নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে এই উপদেষ্টা বলেন, এটা অত্যন্ত জরুরি। ভবিষ্যতে যাতে অতীতের মতো শাসনব্যবস্থা না দেখতে হয়, সে জন্য এটা করতে হবে। সরকার প্রচার করছে। নির্বাচন কমিশনকেও গণভোট নিয়ে মাঠে নামতে হবে। সে ক্ষেত্রে যা সহযোগিতা দরকার, তা সরকার করবে।

সুজনকে জেলায় জেলায় গিয়ে প্রচার এবং অন্যদেরও যুক্ত করে ২০০৭ সালের মতো সহযোগিতা করার আহ্বান জানান উপদেষ্টা সাখাওয়াত। তিনি বলেন, ‘সরকার যা-ই করুক না কেন, গণভোটের বিষয়টাকে জনগণের দুয়ারে নিতে সুজনের মতো সংগঠনের ভূমিকা দরকার। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও আরও জোরালো হওয়া প্রয়োজন বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি।’

উপদেষ্টার বক্তব্যের পর বৈঠকে সুজনের প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজুমদার তাকে আশ্বস্ত করে বলেন, ২০০৭-০৮ সালের মতো করে এবারও আমরা প্রচার-প্রচারণা করছি। তরুণ ও নারীদের মবিলাইজ করার চেষ্টা করছি। গণভোটটা আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমরা লেগে থাকব।

‘দলগুলোর অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে’

গোলটেবিল বৈঠকে আলোচনার শুরুতে সুজনের প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছে, কিন্তু স্বৈরাচারী ব্যবস্থা রেখে গেছে। স্বৈরাচারী কাঠামো ভাঙতে হলে সংস্কার লাগবে। আবারও যাতে আমাদের ওপর দানবের শাসন জেঁকে না বসে, তার জন্যই সংবিধানে কতগুলো মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। তার জন্যই গণভোট হচ্ছে। কিন্তু গণভোট নিয়ে অস্পষ্টতা আছে, নানা রকম বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারও চালানো হচ্ছে। এ সম্পর্কে ভুল-বোঝাবুঝির অবসান প্রয়োজন।’

গণভোটে তারা হ্যাঁ নাকি না-এর পক্ষে, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান পরিষ্কার করার আহ্বান জানান বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যাশা, যেহেতু দলগুলো সনদে স্বাক্ষর করেছে ও এটি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে, তাই তারাও গণভোটের ব্যাপারে জনগণকে সচেতন করার জন্য কার্যক্রম পরিচালনা করবে। আশা করি, তারা তাদের অঙ্গীকার রক্ষা করবে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে চলচ্চিত্র পরিচালক কাজী হায়াৎ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোই প্রান্তিক ভোটারদের বুথে নিয়ে পৌঁছাবে। তিনি বলেন, ‘গ্রামীণ নিরক্ষর নারী সখিনা আপার কাছে আমাদের এই খবরটা পৌঁছাতে হবে যে তোমার অস্তিত্ব জাহির করার জন্য হ্যাঁ-না ভোট দেওয়ার সুযোগ এসেছে, তোমার ক্ষমতা প্রকাশ করার সুযোগ এসেছে, সুযোগটা হেলায় হারিও না?’

সুজনসহ বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের জেলা পর্যায়ের প্রতিনিধিরাও বৈঠকে অংশ নেন। তাদের কেউ বক্তাদের প্রশ্ন করেন, কেউ দেন মতামত। সুজনের সহসভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবদুল মতিন এতে সভাপতিত্ব করেন।

সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের নিজেদের অঙ্গীকার রক্ষা করতে হবে। গণভোটের পক্ষে ধর্মীয় নেতাদের দিয়ে প্রচার করলে সেটা কার্যকর হবে। সংস্কার না হলে জনগণ যে আবার ফ্যাসিবাদে চলে যাবে, এটা প্রচার করতে হবে।

-মামুন