মায়ের পরকীয়া, বাবার অবহেলা: স্নেহবঞ্চিত ৭ বছরের মারিয়ার ঠিকানা এখন চাইল্ড হোম

জয়নাল আবেদীন জয় | জেলা প্রতিনিধি, জয়পুরহাট

জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে মায়ের পরকীয়া ও বাবার চরম অবহেলায় স্নেহবঞ্চিত সাত বছর বয়সী এক শিশুর ঠিকানা হচ্ছে সরকারি শিশু পরিবার (চাইল্ড হোম কেয়ার)। স্থানীয় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হস্তক্ষেপে শিশুটির মানবেতর জীবনের চিত্র উঠে আসে এবং তাকে সরকারি সুরক্ষায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

যেভাবে নজরে আসে মারিয়া
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘অপেক্ষার সিঁড়ি ফাউন্ডেশন’ সম্প্রতি এতিম ও দুস্থ শিক্ষার্থী শনাক্ত করতে পাঁচবিবি উপজেলার আটাপুর ইউনিয়নে একটি জরিপ পরিচালনা করছিল। এ সময় তাদের নজরে আসে আটাপুর গ্রামের মো. আয়েজুলের কন্যা মোসাম্মৎ মারিয়া আক্তার। কনকনে শীতের মধ্যেও শিশুটিকে একটি পাতলা জ্যাকেট পরা অবস্থায় এবং খালি পায়ে রাস্তায় ঘোরাঘুরি করতে দেখে ফাউন্ডেশনের সদস্যরা তার সঙ্গে কথা বলেন।

পরে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একটি জরাজীর্ণ টিনশেড ঘরে সে তার ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধা দাদি মোছা. আয়েজাদের সঙ্গে বসবাস করছে।

অশ্রুসিক্ত দাদির বর্ণনা
শিশুটির এমন করুণ অবস্থার কারণ জানতে চাইলে তার দাদি অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে জানান, মারিয়ার বয়স যখন মাত্র এক বছর, তখন তার মা পরকীয়ার সম্পর্কে জড়িয়ে অন্যের হাত ধরে চলে যায়। গত ছয় বছরে তিনি একবারের জন্যও মেয়ের খোঁজ নেননি। অন্যদিকে, মারিয়ার বাবা মো. আয়েজুল মাঝে মধ্যে গ্রামে এলেও মেয়ের খাবার, পোশাক বা পড়াশোনার জন্য কোনো খোঁজখবর নেন না।

বৃদ্ধা দাদি আরও বলেন, “আমি একজন বিধবা, নিজের কোনো জমিজমা নেই। আগে অন্যের বাড়িতে কাজ করে ও বিধবা ভাতা দিয়ে নাতনিকে নিয়ে কোনোমতে চলতাম। কিন্তু এখন বার্ধক্যের কারণে আর কাজ করতে পারি না। আমি কী খাবো, বাচ্চাটা কী খাবে, কী পরাবো—কিছুই জানি না। তাই বাধ্য হয়ে ভাবছিলাম, কেউ দত্তক নিলে দিয়ে দেব, অন্তত দু’মুঠো খাবার তো পাবে।”

সরকারি হস্তক্ষেপ ও নিরাপদ আশ্রয়
বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় ‘অপেক্ষার সিঁড়ি ফাউন্ডেশন’ ব্যক্তিগতভাবে দত্তক না দিয়ে শিশুটিকে সরকারি তত্ত্বাবধানে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি শিশু সহায়তা নম্বর ১০৯৮-এ ফোন করে শিশুটির সার্বিক অবস্থা জানায়। কর্তৃপক্ষ উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে একটি টিম পাঠিয়ে শিশুটিকে সরকারি কোনো চাইল্ড হোম কেয়ারে আশ্রয়ের আশ্বাস দেয়।

একইসঙ্গে কর্তৃপক্ষ ফাউন্ডেশনটিকে শিশুটির জরুরি সহায়তায় এগিয়ে আসার অনুরোধ করলে তারা মারিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্র ও পোশাক কিনে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

স্থানীয় সচেতন মহল আশা প্রকাশ করেছেন, সরকারি তত্ত্বাবধানে শিশুটি নিরাপদ পরিবেশে থেকে শিক্ষা, খাবার ও সঠিক যত্ন পেয়ে একটি সুন্দর ভবিষ্যতের সুযোগ পাবে।