বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া: পররাষ্ট্রনীতিতে ‘সার্বভৌমত্ব–প্রথম’ দর্শনের রূপকার।
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তিন দফা দায়িত্ব পালনকালে (১৯৯১–১৯৯৬ এবং ২০০১–২০০৬) দেশের পররাষ্ট্রনীতিকে একটি স্বতন্ত্র ও দৃঢ় পথে পরিচালিত করেন। জাতীয় সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে তিনি ইসলামি বিশ্ব ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে বিশেষ গুরুত্ব দেন।
পররাষ্ট্রনীতিতে প্রধান অবদানসমূহ
‘লুক ইস্ট’ নীতি
২০০১–২০০৬ মেয়াদে বেগম খালেদা জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ‘লুক ইস্ট’ নীতি গ্রহণ করেন। এর লক্ষ্য ছিল ভারতের বাইরে গিয়ে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বিস্তৃত করা। এই নীতির ফলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন (১৯৯২)
১৯৯২ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস সফরে যান এবং মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানান। জাতিসংঘের মাধ্যমে কূটনৈতিক উদ্যোগের ফলস্বরূপ ১৯৯৩ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়, যার মাধ্যমে ২ লাখ ২৯ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসিত হয়।
গঙ্গার পানি বণ্টন ইস্যু
গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের দাবিতে তিনি জাতিসংঘে বিষয়টি উত্থাপন করেন, যাতে ভারতের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হয়।
ইসলামি বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার
বেগম খালেদা জিয়া মুসলিমপ্রধান দেশ ও ওআইসি’র (ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা) সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে সক্রিয় ছিলেন। তাঁর উদ্যোগে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ে। সৌদি রাজপরিবারের পক্ষ থেকে তাঁকে উচ্চপর্যায়ের আমন্ত্রণ জানানো হয় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার জন্য।
আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা
১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর তাঁর সরকার ‘অপারেশন সি অ্যাঞ্জেল’ সমন্বয় করে, যা ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ সামরিক ত্রাণ কার্যক্রম। এতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত ও জাপানের সামরিক বাহিনী অংশ নেয়।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক: সার্বভৌমত্বকেন্দ্রিক অবস্থান
ভারতের সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার পররাষ্ট্রনীতি প্রায়ই ‘জাতীয়তাবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। তিনি ট্রানজিট সুবিধা ও সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নেন। প্রধানমন্ত্রী ও পরে বিরোধীদলীয় নেতা (১৯৯৬–২০১৪) হিসেবে তিনি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যাতায়াতের জন্য বাংলাদেশি ভূখণ্ড ব্যবহারের বিরোধিতা করেন, যা তাঁর মতে দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী।
তিনি যুক্তি দেন, ভারতের ট্রাকের টোলমুক্ত চলাচল ‘দাসত্বের’ শামিল। পাশাপাশি ১৯৭২ সালের ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি নবায়নের বিরোধিতা করেন, দাবি করেন—এই চুক্তি বাংলাদেশকে ‘শৃঙ্খলিত’ করে রেখেছে।
২০১৮ সালে ঢাকার এক সমাবেশে তিনি বলেন, “বাংলাদেশকে ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যে পরিণত করার যে চেষ্টা চলছে, আমরা তা প্রতিরোধ করব।”
২০০২ সালে তিনি ভারতের পরিবর্তে চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করেন। সে বছর স্বাক্ষরিত এক চুক্তির মাধ্যমে চীন বাংলাদেশের প্রধান সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী হয়ে ওঠে—যার মধ্যে ট্যাংক, ফ্রিগেট ও অন্যান্য অস্ত্র অন্তর্ভুক্ত।
অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও নারী ক্ষমতায়ন
বেগম খালেদা জিয়া বিদেশি বিনিয়োগের ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করেন এবং ১৯৯৩ সালে জেনারেল অ্যাগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফস অ্যান্ড ট্রেড (জিএটিটি) চুক্তিতে সই করে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করেন। তাঁর সময়ে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের বিস্তার ঘটে।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ ১৯৯৩ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সাংবাদিক বারবারা ক্রোসেট লেখেন, বেনজির ভুট্টোর তুলনায় খালেদা জিয়া নারীদের শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং জামানতবিহীন ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে নারী স্বনির্ভরতা বৃদ্ধিতে বেশি সক্রিয় ছিলেন।
২০০৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন তাঁকে বিশ্বের ১০০ ক্ষমতাধর নারীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।
ইতিহাসের পাতায় বিদায়
বেগম খালেদা জিয়া ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে ৮০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। জাতীয় স্বার্থে আপসহীন অবস্থান, সার্বভৌমত্বকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি এবং দৃঢ় রাজনৈতিক নেতৃত্ব—এই উত্তরাধিকার রেখে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবেন।
এম এম সি/










