দেশে পট-পরিবর্তনের পর টানা ৬ মাস ধরে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের নিচে অবস্থান করায় দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও কম।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণপ্রবৃদ্ধির এই ধীরগতি নতুন বিনিয়োগ কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর পড়তে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নতুন বিনিয়োগ না হলে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে না। বর্তমান ঋণপ্রবৃদ্ধি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দেশে নতুন শিল্প স্থাপন কিংবা বিদ্যমান শিল্প সম্প্রসারণে বিনিয়োগ খুবই সীমিত। বিনিয়োগ কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব কর্মসংস্থান ও জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে পড়ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বরে বেসরকারি খাতে মোট ঋণ বিতরণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৭৭ হাজার ৩৮২ কোটি টাকায়, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে এ অঙ্ক ছিল ১ লাখ ৬৬ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ঋণ বেড়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। উল্লেখযোগ্য যে, এর আগের মাস অক্টোবরে এই প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছিল ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৬ দশমিক ২৩ শতাংশে। একই সঙ্গে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির দায় পরিশোধ ১৬ শতাংশেরও বেশি কমেছে, যা বিনিয়োগ স্থবিরতার আরেকটি শক্ত প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ব্যাংকারদের ভাষ্য অনুযায়ী, উচ্চ সুদহার, দুর্বল বাজার চাহিদা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন ঋণ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে না। তিনি জানান, বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে মেশিন স্থাপন করেও যদি দীর্ঘ সময় স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন চালানো না যায়, তাহলে তা বড় ধরনের লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনেক বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে বা সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালাচ্ছে। নাসা, বেক্সিমকো ও গাজীর মতো শিল্পগোষ্ঠীর বেশ কয়েকটি কারখানা বন্ধ বা আংশিক চালু রয়েছে, আর যেগুলো চালু আছে সেগুলোও আগের তুলনায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কম উৎপাদনে চলছে।
পূবালী ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী মনে করেন, নির্বাচনের পর ব্যবসায়িক পরিবেশ স্বাভাবিক হলে বিনিয়োগ বাড়বে এবং তার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধিও গতি পাবে।
বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৫ থেকে ১৬ শতাংশে পৌঁছানোয় ব্যবসায়ীদের মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। উদ্যোক্তাদের মতে, এই উচ্চ সুদহারে নতুন বিনিয়োগ করা কার্যত কঠিন হয়ে পড়েছে। এর পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটও উৎপাদন কার্যক্রমে বড় বাধা সৃষ্টি করছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই সংকটের কারণে অনেক ব্যবসায়ী লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছেন না এবং বছরের শেষে লোকসানের মুখে পড়ছেন।
বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো এখন তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বেশি অর্থ বিনিয়োগ করছে। ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, সরকারি সিকিউরিটিজে প্রায় ১১ শতাংশ সুদ পাওয়া যায় এবং ঝুঁকি প্রায় শূন্য হওয়ায় ব্যাংকগুলোর আয়ের একটি বড় অংশ এখন এই খাত থেকে আসছে।
২০২৫ সালের শুরুতে আমানতের সুদহার বৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ঋণচাহিদা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা নিয়ে যে আশঙ্কা ছিল, বাস্তবে পরিস্থিতি আরও স্পষ্টভাবে বিনিয়োগ স্থবিরতার দিকেই ইঙ্গিত করছে।
-আফরিনা সুলতানা










