খুলনা জেলায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে বেশকিছু প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল ও স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুসারে মনোনয়ন যাচাইয়ের সময় বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভুল, অনিয়ম বা বিধি লঙ্ঘনের কারণে যারা শর্ত পূরণ করতে পারেনি, তাদের প্রার্থীতা বাতিল করা হয়েছে, যা স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করছে।
খুলনা-১ (দাকোপ–বটিয়াঘাটা) আসনে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে তিন জন প্রার্থীর প্রার্থীতা বাতিল করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে খুলনা জেলা রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক আ. স. ম. জামশেদ খোন্দকার জানান, ওই আসনে মোট ১৩ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। বহু নির্ধারিত শর্ত পূরণ না করায় তিন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয় ও ১০ জনের প্রার্থীতা বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। বাতিল হওয়া প্রার্থীদের মধ্যে অন্যতম হলো গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী জিএম রোকনুজ্জামান, যিনি প্রস্তাবকারী ভোটার তালিকা ভিন্ন জেলার থাকার কারণে শর্ত পূরণ করতে পারেননি। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী গোবিন্দ হালদার ও অচিন্ত্য কুমার মণ্ডলের মনোনয়ন বাতিল করা হয়, যেখানে গোবিন্দ হালদারের ক্ষেত্রে দলীয় মনোনয়নপত্র দাখিল না করা ও স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এছাড়া যাচাই-বাছাই শেষে ইসলামী আন্দোলন, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, কমিউনিস্ট পার্টি, মাইনরিটি জাতীয় পার্টি ও সম অধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা বৈধ প্রার্থী হিসেবে খালি মাঠে থাকার সুযোগ পেয়েছেন।
খুলনা-৪ আসনের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়। এই আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম আজমল হোসেনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে এবং ৪ প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
এরপর ২ জানুয়ারি মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের তৃতীয় দিনে খুলনা-৫ ও খুলনা-৬ আসনে তিন জন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে এবং আরেক প্রার্থীর মনোনয়ন স্থগিত রাখা হয়েছে। জেলা রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক জানান, খুলনা-৫ আসনের জাতীয় পার্টির প্রার্থী শামীম আরা পারভীন (ইয়াসিন) এবং খুলনা-৬ আসনের জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর সহ স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আছাদুল বিশ্বাসের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। একই সময়ে খুলনা-৫ আসনের ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী শেখ মুজিবুর রহমানের মনোনয়ন স্থগিত রাখা হয়েছে, যাকে সিদ্ধান্তটি পর্যালোচনার জন্য রাখার কথা জানানো হয়েছে।
এই আসনগুলোতে মনোনয়ন বাতিলের পর বর্তমান বৈধ প্রার্থীরা নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশ নিতে পারবেন।খুলনা-৪ আসনে মনোনয়নপত্র বৈধ হওয়া প্রার্থীরা হলেন, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী ইউনুস আহম্মেদ সেখ, বিএনপি’র প্রার্থী এস কে আজিজুল বারী, খেলাফত মজলিসের প্রার্থী এস এম সাখাওয়াত হোসাইন ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোঃ কবিরুল ইসলাম।
খুলনা-৫ আসনে বৈধ হিসেবে ঘোষণা পাওয়া প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর গোলাম পরওয়ার, বিএনপির মোহাম্মদ আলি আসগার, কমিউনিস্ট পার্টির চিত্ত রঞ্জন গোলাদার ও খেলাফত মজলিসের মো. আব্দুল কাইউম জমাদ্দার। একইভাবে, খুলনা-৬ আসনে বিএনপির এসএম মনিরুল হাসান বাপ্পী, জামায়াতে ইসলামীর মো. আবুল কালাম আজাদ, ইসলামী আন্দোলনের মো. আছাদুল্লাহ ফকির ও কমিউনিস্ট পার্টির প্রশান্ত কুমার মণ্ডল বৈধ প্রার্থী হিসেবে শাখায় রয়েছেন। এই মনোনয়ন বাতিল ও স্থগিতের সিদ্ধান্তগুলো নির্বাচন কমিশনের কঠোর যাচাই-বাছাই নীতির প্রতিফলন। নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিয়ম মেনে চলা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে কমিশন প্রতিটি মনোনয়নপত্র যাচাই করে থাকেন। এসময় যদি কোনো শর্তপূরণে ঘাটতি বা ভুল পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর আবেদন বাতিল করা হয় এবং প্রার্থীর কাছে সমসাময়িক আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগও রাখা হয়। ফলে প্রার্থীরা প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে পরবর্তী পর্যায়ে আবেদন পুনরায় জমা দিতে পারে বা আইনি পথে আপিল করতে পারে।
খুলনা জেলায় এই মনোনয়ন বাতিলের ঘটনা স্থানীয় রাজনৈতিক গতিশীলতায় প্রভাব ফেলবে, বিশেষত যেখানে দলীয় প্রতিযোগিতা তীব্র এবং বিরোধী প্রার্থীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এর ফলে কিছু আসনে সম্ভাব্য ভোট ভাগাভাগি ও নির্বাচনী রণনীতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা আগামী নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
সার্বিকভাবে খুলনা আসনে মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের এই ফলাফল স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার বিষয় রয়েছে; প্রার্থীরা পরিচ্ছন্ন ও নিয়মপন্থী নির্বাচনী লড়াইয়ের লক্ষ্যে এখন থেকে তাদের প্রচারণা আরও জোরদার করার দিকে মনোযোগ দেবেন বলে ধারণা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
আফরিনা সুলতানা/










