মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) থেকে সনদ পাওয়া সত্ত্বেও এত দিন দেশের ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট অঞ্চলের বাইরে কার্যক্রম চালাতে পারত না। এক জেলার অনুমতি থাকলে পাশের জেলায় কাজ করার সুযোগ ছিল না। এবার সেই সীমাবদ্ধতা তুলে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ লক্ষ্যে এমআরএ বিধিমালা–২০১০ সংশোধন করে আঞ্চলিক সীমা–সংক্রান্ত ধারা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। সংশোধন কার্যকর হলে যেকোনো ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান সারা দেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। শুধু আঞ্চলিক সীমাই নয়, সনদের শর্ত ভঙ্গসহ বিদ্যমান বিধিমালার মোট ৩১টি বিধি ও উপবিধি সংশোধনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
এমআরএর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৬৮৩টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের বেশির ভাগই আঞ্চলিক পর্যায়ে কাজ করছে। এর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতির জন্য আবেদন করে রেখেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণকারী সদস্যের সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ২৩ লাখ, যার প্রায় ৯১ শতাংশ নারী।
এমআরএর নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এসব তথ্য উল্লেখ করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেককে চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে জানানো হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, এমআরএ, পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এবং ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে গত আগস্টে দুই দফা আলোচনার ভিত্তিতেই সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আলোচনার সুপারিশ অনুযায়ী প্রণীত সংশোধিত খসড়া বিধিমালা ইতোমধ্যে এমআরএর পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন পেয়েছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক জানিয়েছেন, খসড়া বিধিমালা বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং শিগগিরই আইনি যাচাইয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর সংশোধিত বিধিমালা জারি করা হবে।
সংশোধিত বিধিমালায় ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়ের ঠিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম যুক্ত হচ্ছে। আগে শুধু এমআরএকে জানালেই ঠিকানা পরিবর্তন করা যেত, এখন থেকে এর জন্য এমআরএর পূর্বানুমোদন নিতে হবে।
সনদ বাতিলের ক্ষেত্রেও ভাষাগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে। আগে বলা ছিল, সনদে উল্লিখিত শর্ত ভঙ্গ হলে সনদ বাতিল করা যাবে। সংশোধনীতে বলা হচ্ছে, সনদের যেকোনো শর্ত ভঙ্গ হলেই সনদ বাতিলযোগ্য হবে। এমআরএর মতে, আগের ভাষা অনুযায়ী সব শর্ত ভঙ্গ না হলে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন ছিল, যা গ্রাহকস্বার্থের পরিপন্থী।
এ ছাড়া ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে এমআরএ নিজ উদ্যোগে বহির্নিরীক্ষক বা নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিতে পারবে—এমন বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে সাধারণ পর্ষদের মাধ্যমে নিরীক্ষক নিয়োগের নিয়ম প্রযোজ্য হবে না।
পরিচালনা পর্ষদ সংক্রান্ত বিধিতেও পরিবর্তন আসছে। আগে এক মেয়াদে পর্ষদের অর্ধেকের কম সদস্য পরিবর্তনের শর্ত ছিল, এখন প্রস্তাব করা হয়েছে—এক মেয়াদে মোট সদস্যের এক–তৃতীয়াংশের বেশি পরিবর্তন করা যাবে না। বিশেষ পরিস্থিতিতে এমআরএর অনুমোদন সাপেক্ষে ব্যতিক্রম করা যাবে।
তহবিল ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সাধারণ পর্ষদের সদস্যদের কাছ থেকে অনুদানের পাশাপাশি ঋণ নেওয়ার সুযোগ যুক্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্রাহক ছাড়া অন্য ব্যক্তির কাছ থেকে ঋণ নেওয়া সংক্রান্ত একটি উপবিধি বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে।
নতুন সংযোজন হিসেবে গ্রাহক ও আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় এমআরএ চাইলে যেকোনো ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানে এক বছরের জন্য পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিতে পারবে। পাশাপাশি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগ, অপসারণ বা অব্যাহতির ক্ষেত্রেও এমআরএর অনাপত্তি বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। শাখা কার্যালয় খোলা বা বন্ধ করার ক্ষেত্রে অন্তত ৩০ দিন আগে এমআরএকে জানানোর বিধানও যুক্ত হচ্ছে।
এমআরএর নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান জানান, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামতের ভিত্তিতেই এই সংশোধনী প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে এবং এখন দ্রুত তা কার্যকর হওয়ার অপেক্ষা করা হচ্ছে।
ক্ষুদ্রঋণ খাতের একাধিক সাবেক কর্মকর্তা মনে করছেন, সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দেশজুড়ে কাজ করার সুযোগ তৈরি হওয়াকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা যায়। তবে সনদ বাতিলের আগে সংশোধনের সুযোগ থাকা প্রয়োজন বলেও মত দিয়েছেন তারা।










