রাশিয়ার নভগোরড অঞ্চলের ‘ডলগিয়ে বোরোডি’ (ভলদাই) নামক প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সুরক্ষিত বাসভবনে গত ২৯ ডিসেম্বর এক ভয়াবহ ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই হামলাকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। হামলার জন্য মস্কো সরাসরি ইউক্রেনকে দায়ী করলেও কিয়েভ তা অস্বীকার করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিরক্ষা ডেপুটি আন্ডার সেক্রেটারি স্টিফেন ব্রায়েন এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দাবি করেছেন, এই হামলাটি এমন এক সন্ধিক্ষণে হয়েছে যা ইউক্রেনের জন্য মার্কিন নিরাপত্তা গ্যারান্টি এবং ভবিষ্যৎ শান্তি আলোচনার পথকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, হামলার দিন ব্রায়ানস্ক ও নভগোরড অঞ্চলে মোট ৯০টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। পুতিনের বাসভবনে হামলার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে ইউক্রেনীয় প্রযুক্তির ‘ইউজে-২৬ বিভার’ এবং চীনা ইঞ্জিনচালিত ‘চাকলুন’ ড্রোন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১ হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিতে সক্ষম এই ড্রোনগুলো পুতিনের বাসভবনের দুর্ভেদ্য প্যান্টশির এস-১ ও এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ড্রোনগুলো স্টারলিংক মিনি টার্মিনাল ব্যবহার করায় রাশিয়ার ইলেকট্রনিক জ্যামিং ব্যবস্থা কাজ করেনি।
হামলাটি এমন এক সময়ে হয়েছে যখন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের মার-আ-লাগোতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে বৈঠকে ছিলেন। বিশ্লেষক স্টিফেন ব্রায়েন প্রশ্ন তুলেছেন, জেলেনস্কি কি এই হামলার বিষয়ে জানতেন?
যদি তিনি জেনে থাকেন, তবে তার দ্বিমুখী নীতি প্রকাশ পায়। আর যদি তিনি না জানেন, তবে এটি ইঙ্গিত দেয় যে ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা সংস্থা (SBU) বা সামরিক বাহিনীর ওপর তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, এটি ইউক্রেনীয় ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-৬-এর একটি যৌথ অপারেশন হতে পারে, যার লক্ষ্য শান্তি আলোচনা নস্যাৎ করা।
ট্রাম্প ও জেলেনস্কির মধ্যে ১৫ বছরের এক নিরাপত্তা চুক্তির প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে, যেখানে ইউক্রেনে মার্কিন সেনা মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। ব্রায়েন তার বিশ্লেষণে সতর্ক করেছেন যে, ইউক্রেন যখন সরাসরি রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডে এবং প্রেসিডেন্টের বাসভবনে হামলা চালাচ্ছে, তখন মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হবে চরম আত্মঘাতী। ইউক্রেনের উসকানিমূলক কোনো পদক্ষেপের জবাবে রাশিয়া পাল্টা হামলা চালালে মার্কিন সেনারা সরাসরি যুদ্ধের মুখে পড়বে, যা পরিস্থিতিকে পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
ক্রেমলিন এই হামলাকে প্রেসিডেন্ট পুতিনকে সরাসরি হত্যার চেষ্টা হিসেবে দেখছে। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ এই বিষয়ে ট্রাম্পকে টেলিফোনে অবহিত করেছেন। এই ঘটনার ফলে রাশিয়ার পক্ষ থেকে কঠোর প্রতিশোধমূলক হামলার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে কিয়েভ ও মস্কোর মধ্যে যে কোনো ধরনের যুদ্ধবিরতি বা শান্তি সমঝোতার সম্ভাবনা কার্যত ভেস্তে যেতে পারে।
স্টিফেন ব্রায়েন মনে করেন, ইউক্রেনকে ‘ন্যাটো’র আদলে নিরাপত্তা দেওয়া হবে মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। ইউক্রেনীয় নেতৃত্বের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত না করে তাদের নিরাপত্তা গ্যারান্টি দেওয়া মানে হলো জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালা।
ছায়াযুদ্ধ যখন রাষ্ট্রপ্রধানদের শয়নকক্ষ পর্যন্ত পৌঁছায়, তখন কূটনৈতিক আলোচনার পথ সংকুচিত হয়ে আসে এবং বিশ্ব এক ভয়াবহ সংঘাতের দিকে ধাবিত হয় বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
-এম. এইচ. মামুন










