যেভাবে ‘আপসহীন’ নেত্রী হয়ে উঠলেন বেগম খালেদা জিয়া

খালেদা জিয়ার ‘আপসহীন’ নেত্রী হয়ে ওঠার গল্পটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক উত্থান নয়; এটি একজন গৃহবধূর প্রবল আত্মবিশ্বাসে রূপান্তর এবং চরম প্রতিকূলতার মুখে মাথা নত না করার এক দীর্ঘ মহাকাব্য। আসুন দেখে নিই তাঁর এই রাজনৈতিক যাত্রার মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনাপ্রবাহ-

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। রাজনীতি থেকে দূরে থাকা খালেদা জিয়া তখন দুই সন্তান নিয়ে এক গভীর শোকের সাগরে। কিন্তু জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপি যখন ভাঙনের মুখে, তখন দলের অস্তিত্ব রক্ষায় ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণ করেন। রাজনীতিতে তাঁর অভিষেক ছিল এক প্রকার বাধ্যবাধকতা থেকে, কিন্তু দ্রুতই তিনি নিজেকে দলের অপরিহার্য নেতা হিসেবে প্রমাণ করেন।

এরশাদ বিরোধী আন্দোলন: ‘আপোসহীন’ উপাধির জন্ম

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় ১৯৮০-র দশকের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন। তৎকালীন সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদ রাজনৈতিক দলগুলোকে বিভক্ত করার চেষ্টা করছিলেন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগসহ অনেক দল অংশ নিলেও খালেদা জিয়া সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন—”স্বৈরাচারের অধীনে কোনো নির্বাচন নয়।”

  • বিস্ময়কর দৃঢ়তা: আন্দোলনের সময় তিনি বারবার গ্রেফতার ও গৃহবন্দি হন। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে তাঁকে অন্তত আটবার আটক করা হয়।
  • ভোট বর্জন: ১৯৮৮ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচন বর্জন করে তিনি প্রমাণ করেন যে, ক্ষমতার চেয়ে আদর্শ তাঁর কাছে বড়। তাঁর এই আপস না করার মানসিকতাই তাঁকে জনগণের কাছে ‘দেশনেত্রী’ এবং ‘আপোসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত করে তোলে।

১৯৯১-এর ম্যান্ডেট: প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী

দীর্ঘ নয় বছরের লড়াইয়ের পর ১৯৯০-এর ডিসেম্বরে এরশাদের পতন ঘটে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। তিনি বাংলাদেশের প্রথম এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হন। সংসদীয় গণতন্ত্রে উত্তরণে তাঁর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক।

২০০৭-এর ওয়ান ইলেভেন: “দেশই আমার ঠিকানা”

খালেদা জিয়ার আপোসহীন চরিত্রের আরেকটি বড় পরীক্ষা আসে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি পরবর্তী সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। তৎকালীন ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা অনুযায়ী দুই নেত্রীকে দেশছাড়া করার চেষ্টা চলে। শেখ হাসিনা তখন দেশের বাইরে থাকলেও খালেদা জিয়া দেশেই ছিলেন। তাঁকে দেশ ছাড়ার জন্য প্রচণ্ড চাপ দেওয়া হয়। তখন তাঁর সেই ঐতিহাসিক উক্তি—”বিদেশে আমার কোনো ঘরবাড়ি নেই, দেশই আমার ঠিকানা। আমি মরলে এদেশেই মরব”—তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৭ সালে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং তিনি দীর্ঘ এক বছর কারাগারে কাটান, তবুও দেশ ছাড়ার প্রস্তাবে রাজি হননি।

পরবর্তী লড়াই এবং কারাবাস: চূড়ান্ত পরীক্ষা

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে তিনি কারাগারে যান। এই সময়টি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। নির্জন কারাগারে দীর্ঘকাল অবস্থান এবং বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা বা ‘প্যারোল’ নিয়ে বিদেশ যাওয়ার প্রস্তাব বারবার ফিরিয়ে দেন। তাঁর সমর্থকদের মতে, নিজের অসুস্থতার চেয়েও রাজনৈতিক নীতিকে প্রাধান্য দেওয়া তাঁর ‘আপোসহীন’ সত্তারই বহিঃপ্রকাশ। যখনই দল বা নিজের ওপর সংকট এসেছে, তিনি পালানোর বদলে মুখোমুখি হতে পছন্দ করেছেন। তিনি নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের এক শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তাঁর অনমনীয় ভাবমূর্তি মাঠপর্যায়ের কর্মীদের এই বার্তা দেয় যে, শীর্ষ নেতৃত্ব পরাজয় মানবে না।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁর ‘আপোসহীন’ পরিচয়টি কোনো কৃত্রিম প্রচারণা নয়, বরং চার দশকের রাজনৈতিক জেল-জুলুম এবং ক্ষমতার হাতছানি উপেক্ষা করার এক নিরবচ্ছিন্ন লড়াইয়ের ফসল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে তিনি কেবল একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নন, বরং এক চরম ধৈর্যশীল এবং অনমনীয় নেতৃত্বের নাম।

 

-এম. এইচ. মামুন