থার্টি ফাস্ট নাইট: ইসলামি দৃষ্টিকোণ ও অপসংস্কৃতির বেড়াজাল

ইংরেজি বছরের শেষ রজনী বা ৩১ ডিসেম্বর দিবাগত রাতকে বলা হয় ‘থার্টি ফাস্ট নাইট’। বর্তমান সময়ে এই রাত উদযাপন একটি বৈশ্বিক উৎসবে রূপ নিয়েছে, যা আমাদের দেশেও তরুণ সমাজের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। আতশবাজি, ডিজে পার্টি, এবং বাঁধনহারা উল্লাসের মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া হয়। তবে, একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে আমাদের জানা প্রয়োজন—এই উদযাপন সম্পর্কে ইসলাম কী বলে? কুরআন ও হাদীসের আলোকে এর বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা একান্ত জরুরি।

১. বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুসরণ (তাশাব্বুহ)
ইসলামে আনন্দ-উৎসবের নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। ইসলামি শরিয়ত মতে, মুসলিমদের জন্য বাৎসরিক উৎসব হলো দুটি ঈদ (ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা)। এর বাইরে বিজাতীয় কোনো সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। থার্টি ফাস্ট নাইট মূলত পশ্চিমা ও অমুসলিম সংস্কৃতির অংশ।

রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন:

“যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।” (সুনানে আবু দাউদ: ৪০৩১)

অর্থাৎ, অমুসলিমদের ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক কোনো উৎসব পালন করা বা তাদের রীতিনীতির অনুকরণ করা মুসলিমদের জন্য বৈধ নয়।

২. সময়ের অপচয় ও অপব্যয় (ইসরাফ)
থার্টি ফাস্ট নাইটের নামে কোটি কোটি টাকা আতশবাজি, আলোকসজ্জা ও পার্টির পেছনে খরচ করা হয়। অথচ সমাজে অসংখ্য মানুষ দরিদ্র ও ক্ষুধার্ত। ইসলামে অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন:

“নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ।” (সূরা বনি ইসরাইল: ২৭)

রাত জেগে অনর্থক সময় নষ্ট করা এবং অর্থের অপচয় করা আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার বিষয়।

৩. অশ্লীলতা ও পাপাচার
এই রাত উদযাপনের নামে অনেক ক্ষেত্রে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, মদ্যপান এবং নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার আয়োজন করা হয়। ইসলামে এগুলো কবিরা গুনাহ। আল্লাহ তায়ালা অশ্লীলতার কাছেও যেতে নিষেধ করেছেন।

পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

“তোমরা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অশ্লীলতার কাছেও যেও না।” (সূরা আল-আন’আম: ১৫১)

যেখানে গান-বাজনা ও অশ্লীলতার সয়লাব ঘটে, সেখানে আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয় না; বরং গজব নাজিল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

৪. সময়ের মূল্য ও আত্মপর্যালোচনা (মুহাসাবা)
একজন মুমিনের কাছে সময়ের মূল্য অনেক। একটি বছর চলে যাওয়া মানে জীবন থেকে একটি বড় অংশ ফুরিয়ে যাওয়া এবং মৃত্যুর দিকে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। তাই বছর শেষে উল্লাস না করে বরং নিজের কৃতকর্মের হিসাব নেওয়া উচিত।

হযরত উমর (রা.) বলতেন:

“তোমরা নিজেদের হিসাব নিজেরা নাও, চূড়ান্ত হিসাব দিবসে তোমাদের কাছ থেকে হিসাব নেওয়ার আগেই।”

তাই নতুন বছর বা পুরাতন বছরের সন্ধিক্ষণে একজন মুসলিমের কাজ হলো—বিগত জীবনের ভুলের জন্য তওবা করা এবং আগামী দিনগুলোতে নেক আমল করার পরিকল্পনা করা।

৫. মুমিনের করণীয়
থার্টি ফাস্ট নাইট বা ইংরেজি নববর্ষ পালন ইসলামের দৃষ্টিতে জায়েজ নয়। এই রাতে মুসলিমদের করণীয় হলো:

নিজ পরিবার ও সন্তানদের এই অপসংস্কৃতি থেকে দূরে রাখা।

রাত জেগে ফানুস ওড়ানো বা আতশবাজি ফোটানো থেকে বিরত থাকা, কারণ এতে জনদুর্ভোগ ও অগ্নিঝুঁকি তৈরি হয়। ইসলামে অন্যকে কষ্ট দেওয়া হারাম।

আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকা এবং দেশ ও জাতির মঙ্গলের জন্য দোয়া করা।

উপসংহার সভ্য ও শালীন জাতি হিসেবে আমাদের উচিত নিজস্ব ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ বজায় রাখা। ক্ষণিকের আনন্দের জন্য পরকাল নষ্ট করা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তাই আসুন, বিজাতীয় অপসংস্কৃতি বর্জন করি এবং কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালনা করি।