আস্থাহীনতায় ধুঁকছে পুঁজিবাজার

ছবি: জনকণ্ঠ

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নীতিগত অনিশ্চয়তার প্রভাবে দেশের পুঁজিবাজার থেকে হতাশা যেন আর পিছু ছাড়ছে না। গত বছরের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর টানা তিন দিন দেশে কার্যত কোনো সরকার না থাকায় বাজারে সাময়িক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও নতুন সরকার গঠনের পর সেই গতি ধরে রাখা যায়নি। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের খবরে সূচক বাড়লেও পরবর্তীতে তা আবার নিম্নমুখী হয়।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। বাজার বিশ্লেষণের ঘাটতি ও আস্থার সংকটের কারণে ভালো ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ারও দরপতনের শিকার হচ্ছে। সরকার পতন, নতুন সরকার গঠন এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বেসরকারি বিনিয়োগ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

বাজারে কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বর্তমান কমিশনের নেওয়া কঠোর অবস্থানও নতুন করে বড় বিনিয়োগ আসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে একদিকে নতুন বিনিয়োগ আসছে না, অন্যদিকে আগের বিনিয়োগকারীরাও ঝুঁকি এড়িয়ে বাজার থেকে সরে যাচ্ছেন।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল দেশের পুঁজিবাজার ইতিহাসে সবচেয়ে নিষ্ক্রিয় ও হতাশাজনক সময়গুলোর একটি হয়ে উঠছে। পুরো বছরজুড়ে নতুন বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ ছিল। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো নতুন মূলধন আসেনি, কাটেনি তারল্য সংকটও। বছরের শেষ পর্যায়েও বাজারে গতি ফেরার কোনো লক্ষণ নেই।

এই পরিস্থিতির বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির অভাব। চলতি বছরে কোনো প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বা কোয়ালিফায়েড ইনভেস্টর অফার (কিউআইও) অনুমোদন পায়নি। ফলে বাজারে নতুন মূলধন প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়নি। অথচ দেশের পুঁজিবাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ বিনিয়োগকারীই ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী, যাঁদের নিষ্ক্রিয়তা বাজারকে আরও স্থবির করে তুলেছে।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রেও সুযোগ ছিল সীমিত। চলতি বছরে করপোরেট বন্ড ও মিউচুয়াল ফান্ড অনুমোদন ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ফলে ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগও প্রত্যাশিত মাত্রায় আসেনি।

এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাজারের লেনদেন ও সূচকে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স কমেছে প্রায় ৪০০ পয়েন্ট। লেনদেন নেমে এসেছে বহু বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও একই চিত্র দেখা গেছে।

বাজারে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা দ্রুত কমছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় ৬৬ হাজার বিনিয়োগকারী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। অনেকেই বিও হিসাব বন্ধ করেছেন বা শেয়ারশূন্য অবস্থায় রয়েছেন।

বিনিয়োগকারীদের ধরে রাখতে বিও হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ ফি কমানো হলেও তাতে আস্থা ফেরানো যায়নি। এর প্রভাব পড়েছে ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ওপরও। চলতি বছর অন্তত ১১৭টি ব্রোকারেজ অফিস বন্ধ হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান শাখা অফিস গুটিয়ে নিয়ে প্রধান কার্যালয়ের কার্যক্রমও সীমিত করেছে।

সাদ সিকিউরিটিজের চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসাইন বলেন, দীর্ঘদিন নতুন আইপিও না থাকায় বাজারে বিনিয়োগকারী আসছে না। বিনিয়োগকারী না থাকলে ব্রোকারেজ ব্যবসাও টিকে থাকা কঠিন।

এদিকে শরিয়াহভিত্তিক একাধিক ব্যাংক তালিকাচ্যুত হওয়া এবং কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের অনুমোদন বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। এক টাকার নিচে নেমে যাওয়া শেয়ারের লেনদেন সচল রাখতে স্টক এক্সচেঞ্জকে নতুন টিক সাইজ চালু করতে হয়েছে।

ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে লেনদেন কমে যাওয়া, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও আস্থার অভাব তাঁদের চরম হতাশায় ফেলেছে। অনেক ভালো কোম্পানির শেয়ার প্রকৃত মূল্যের অনেক নিচে লেনদেন হচ্ছে।

তবে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ আশা প্রকাশ করে বলেন, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠিত হলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটলে বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে কিছু মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ার তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি ও তথ্যভিত্তিক বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আফরিনা সুলতানা/