বর্তমান বিশ্বের চিকিৎসাবিজ্ঞানের সামনে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ সক্ষমতা। যখন সাধারণ ব্যাকটেরিয়া প্রচলিত ওষুধের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা অর্জন করে, তখন সামান্য অসুখও প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। এই বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় এবার আশার আলো দেখিয়েছেন মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশি তরুণ গবেষক মোহাম্মদ খাইরুজ্জামান।
ইউনিভার্সিটি কেবাংসান মালয়েশিয়া (UKM)-এ পিএইচডি গবেষণায় তিনি এমন কিছু তথ্য ও কৌশল উদ্ভাবন করেছেন, যা কেবল মালয়েশিয়া নয়, বরং পুরো বিশ্বের জনস্বাস্থ্য নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি ‘ব্লু-প্রিন্ট’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
গবেষণার ভয়াবহ চিত্র
খাইরুজ্জামানের গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর ৩০ শতাংশের বেশি মানুষ ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট সংক্রমণে ভুগছেন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—ই. কোলাই (E. coli) এবং এমআরএসএ (MRSA)-এর মতো সাধারণ ব্যাকটেরিয়াগুলো এখন আর প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকে মরছে না। এর ফলে সাধারণ অস্ত্রোপচার বা নিউমোনিয়ার মতো রোগের চিকিৎসা হয়ে পড়ছে দীর্ঘমেয়াদী এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
খাইরুজ্জামানের ‘থ্রি-প্রংড স্ট্র্যাটেজি’: সমাধানের তিন পথ
এই সংকট নিরসনে তিনি তিন ধাপের একটি বিশেষ কৌশল বা ‘থ্রি-প্রংড স্ট্র্যাটেজি’ প্রস্তাব করেছেন, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে:
১. কঠোর স্ক্রিনিং ব্যবস্থা: মালয়েশিয়ায় আসা অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য বিদ্যমান ‘ফমেমা’ (FOMEMA) বা বাধ্যতামূলক মেডিকেল স্ক্রিনিং ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করা। যাতে করে সীমান্ত পার হয়ে কোনো রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া দেশে ঢুকতে না পারে।
২. সমন্বিত ডাটাবেস: ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার গতিবিধি ও বিস্তার নজরদারিতে একটি শক্তিশালী ক্লিনিক্যাল ডাটাবেস তৈরি করা। এর মাধ্যমে চিকিৎসকরা সহজেই জানতে পারবেন কোন এলাকায় কোন ওষুধ কাজ করছে না।
৩. জনসচেতনতা ও শিক্ষা: শুধু ওষুধ বা প্রযুক্তি নয়, সাধারণ মানুষ ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সচেতন করতে বিশেষ শিক্ষা উপকরণ তৈরি ও প্রচারের ওপর তিনি জোর দিয়েছেন। ভুল ডোজে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন বন্ধ করাই এর প্রধান লক্ষ্য।
কেন এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের কারণে বছরে কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। খাইরুজ্জামানের এই গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, ডাটা-নির্ভর নীতিনির্ধারণ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক নজরদারি থাকলে এই বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব। মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য খাতে তার এই প্রস্তাবিত নীতিমালা এখন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও প্রয়োগযোগ্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মোহাম্মদ খাইরুজ্জামানের এই সাফল্য বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের মেধার এক উজ্জ্বল প্রতিফলন। তার প্রস্তাবিত কৌশলগুলো যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের লড়াইয়ে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এটি কেবল একজন ব্যক্তির সাফল্য নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা।
-এম. এইচ. মামুন










