প্রতিবেদকঃ আবু তাহের
দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)-এর মধ্যে ঘোষিত নির্বাচনী সমঝোতা। রোববার বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এই সমঝোতার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
তার ঘোষণার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসলামপন্থী ও সরকারবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো নতুন করে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পথে এগোচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের আমির জানান, এর আগে জামায়াতে ইসলামীসহ আটটি রাজনৈতিক দল একটি অভিন্ন রাজনৈতিক বোঝাপড়ার আওতায় যুগপৎভাবে মাঠে সক্রিয় ছিল।
সাম্প্রতিক আলোচনার ধারাবাহিকতায় সেই জোটে নতুন করে যুক্ত হয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)। এতে করে সমঝোতায় অংশ নেওয়া দলগুলোর সংখ্যা আরও বেড়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘ আলোচনা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে বিভিন্ন সংসদীয় আসনে আসন সমঝোতা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো ভোট বিভাজন রোধ করে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে তোলা। তিনি আরও জানান, কয়েকটি রাজনৈতিক দল এই জোটে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলেও বর্তমান বাস্তবতায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে ভবিষ্যতে আলোচনার পথ উন্মুক্ত থাকবে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণ-অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনীতিতে যে শূন্যতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, এই সমঝোতা তারই প্রতিফলন। এর আগেই জামায়াতের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)—এই ছয়টি দল আসনভিত্তিক সমঝোতার মাধ্যমে সব আসনে একক প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছিল। পরে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টিও এই জোটে যুক্ত হয়। এসব দল একাধিক দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে যুগপৎ কর্মসূচি পালন করে আসছে।
নতুন করে এনসিপি ও এলডিপি যুক্ত হওয়ায় জোটটির রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এনসিপি নিজেকে নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের পক্ষে একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। অন্যদিকে এলডিপি দীর্ঘদিন ধরে সরকারবিরোধী রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছে। এই দুই দলের সংযুক্তি জোটের পরিধি ও সম্ভাব্য ভোটব্যাংককে বিস্তৃত করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এই সমঝোতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও দেখা যাচ্ছে। সমালোচকদের একটি অংশের মতে, আদর্শিক ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও কেবল নির্বাচনী হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে গঠিত জোট দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নাও হতে পারে। অন্যদিকে অনেকের মত, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বৃহত্তর ঐক্য ছাড়া সরকারবিরোধী শক্তির পক্ষে কার্যকর ভূমিকা পালন করা কঠিন।
সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনকালীন রোডম্যাপ কিংবা নির্দিষ্ট আসন বণ্টনের বিস্তারিত প্রকাশ না করা হলেও জামায়াতের আমির জানান, প্রয়োজন হলে তা সময়মতো জানানো হবে। তিনি বলেন, দেশের মানুষের অধিকার, সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে সবাই একমত। সেই লক্ষ্যেই সবাই একসঙ্গে কাজ করতে চান।
এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে। জামায়াতকেন্দ্রিক এই জোট কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে, তা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক শক্তি, ভোটারদের সাড়া এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির গতিপথের ওপর। তবে এটুকু নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এই সমঝোতা আগামী দিনে দেশের নির্বাচনী রাজনীতিকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
মামুন/










