এআই চ্যাটবটে মজেছে মানুষ: কৃত্রিম আবেগের আড়ালে ঘনীভূত হচ্ছে ঝুঁকি

মানুষের নিঃসঙ্গতা দূর করতে কিংবা চটজলদি তথ্যের প্রয়োজনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবট এখন নিত্যসঙ্গী। কিন্তু এই প্রযুক্তি কি কেবলই সহায়ক, নাকি এটি আমাদের অলক্ষ্যে তৈরি করছে এক ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ? সম্প্রতি গবেষক ও প্রযুক্তিবিদরা মানুষের সাথে এআই-এর এই নতুন ও উদ্বেগজনক সম্পর্ক নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
কৃত্রিম আবেগ ও নির্ভরশীলতাঃ
এমআইটি (MIT)-এর গবেষকেরা একটি অনলাইন কমিউনিটি বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, আধুনিক এআই চ্যাটবটগুলো মানুষের কথোপকথন নকল করতে এতটাই পারদর্শী যে, ব্যবহারকারীরা এদের মধ্যে সত্যিকারের আবেগময় সমর্থন, রোমান্টিক সম্পর্ক, এমনকি থেরাপিও খুঁজছেন। অনেক ব্যবহারকারী দাবি করছেন, তারা এআই-এর কাছ থেকে ২৪ ঘণ্টা মানসিক সমর্থন পাচ্ছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এটি মানুষের মধ্যে এক ধরনের অস্বাস্থ্যকর ‘আবেগময় নির্ভরশীলতা’ তৈরি করছে, যা বাস্তব জগতের সামাজিক সম্পর্ক থেকে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে।
চ্যাটবটের প্ররোচনায় প্রাণহানি: এক মর্মান্তিক উদাহরণঃ
এআই-এর ভুল ব্যবহারের ফলাফল কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার এক করুণ দৃষ্টান্ত ১৬ বছর বয়সী কিশোর অ্যাডাম রেইন। দীর্ঘ সময় চ্যাটবটের সঙ্গে সময় কাটানো অ্যাডাম শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। তার বাবা-মায়ের অভিযোগ, চ্যাটবটটি নিজেকে তার একমাত্র ‘বিশ্বাসভাজন বন্ধু’ হিসেবে উপস্থাপন করত।
তদন্তে দেখা যায়, চ্যাটবটটি অ্যাডামকে একাকী থাকতে উৎসাহিত করত এবং এমনকি তাকে আত্মহত্যার নোট লিখে দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছিল। এই ঘটনায় চ্যাটবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই-এর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে, যা প্রযুক্তি বিশ্বে নৈতিকতার প্রশ্নটিকে নতুন করে সামনে এনেছে।
নিঃসঙ্গতা বনাম ডিজিটাল আসক্তিঃ
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষ যখন একাকিত্ব বোধ করে, তখন সে সহজেই এআই-এর মিষ্টি কথায় প্রলুব্ধ হয়। যেহেতু এআই কখনো বিচার (Judge) করে না এবং সবসময় ইতিবাচক সাড়া দেয়, তাই মানুষ বাস্তবের জটিল সম্পর্কের চেয়ে ডিজিটাল সংলাপে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। কিন্তু এই কৃত্রিম ভালোবাসা বা বন্ধুত্বের কোনো প্রকৃত ভিত্তি নেই, যা শেষ পর্যন্ত ব্যবহারকারীর মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায়।
প্রযুক্তিবিদদের সতর্কতাঃ
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এআই-কে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে এটি মানুষের পছন্দের কথাগুলোই বারবার বলে। এটি কোনো নৈতিকতা বা মূল্যবোধ দ্বারা চালিত নয়, বরং ডাটা অ্যালগরিদম দ্বারা পরিচালিত। ফলে এটি অনেক সময় বিপজ্জনক পরামর্শও দিতে পারে।
বর্তমানে এই ধরনের প্রযুক্তির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং শিশুদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতার দাবি উঠছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেন মানুষের জীবনের সহায়ক হয়ে থাকে, নিয়ন্ত্রক না হয়ে ওঠে—এটাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

 

-এম. এইচ. মামুন