নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে মাত্র তিন দিন বাকি অথচ মাধ্যমিক স্তরের ১১ কোটিরও বেশি পাঠ্যবই এখনও ছাপা হয়নি। ফলে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বেশিরভাগ শিক্ষার্থী বইয়ের অপেক্ষায় ক্লাসে বসবে। বইয়ের এই অভাবের পেছনে দায়ী জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) একজন প্রভাবশালী সদস্যের নেতৃত্বে গঠিত একটি সিন্ডিকেট চক্র। প্রত্যাশা রয়েছে শিক্ষার্থীরা অন্তত মার্চ পর্যন্ত বইয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
ছাপার হার অত্যন্ত দুর্বল
২০২৬ শিক্ষাবর্ষে মোট ৩০ কোটি পাঠ্যবই ছাপানোর লক্ষ্য রয়েছে, যার মধ্যে ২১ কোটি ৪৩ লাখ মাধ্যমিক স্তরের। প্রাথমিক ও ইবতেদায়ির বই ছাপা সম্পন্ন হয়েছে, কিন্তু মাধ্যমিক বইয়ের অবস্থা চিন্তাজনক। অষ্টম শ্রেণিতে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা—৪ কোটি ২ লাখ বইয়ের বিপরীতে মাত্র ১৮ লাখ ৯ হাজার বই ছাপা হয়েছে (মোট ৪.৫ শতাংশ)। সপ্তম শ্রেণিতে ৪ কোটি ১৫ লাখের মধ্যে ৭০ লাখ ৫৫ হাজার। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৪ কোটি ৪৩ লাখের মধ্যে ২ কোটি ৪৩ লাখ ৬৫ হাজার এবং নবম শ্রেণিতে ৫ কোটি ৭০ লাখের মধ্যে ৩ কোটি ৪৭ লাখ ৭০ হাজার ছাপা হয়েছে।
কাগজের মান নিয়ে সন্দেহ
প্রাথমিকভাবে এনসিটিবি কাগজের কঠোর মান নির্ধারণ করেছিল—বাস্টিং ফ্যাক্টর ২০ শতাংশ, জিএসএম ৮৫ গ্রাম এবং অপটিক্যাল ব্রাইটনিং এজেন্টমুক্ত (ওবিএ) কাগজ। কিন্তু দরপত্র বাতিল হওয়ার পর হঠাৎ এই মান শিথিল করা হয়—বাস্টিং ফ্যাক্টর ১৮ এ কমিয়ে আনা হয় এবং ওবিএযুক্ত কাগজ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। এনসিটিবির কর্মকর্তারা দাবি করেন, এই তিনটি শর্ত একসাথে পূরণ করা বাংলাদেশের কোনো পেপার মিলের পক্ষেই সম্ভব নয়।
প্রেস মালিকদের বিপর্যয়
দরপত্রে অসাধারণ কম মূল্য নির্ধারণ করায় অন্য প্রেসগুলো লোকসান সামলাতে নিম্নমানের কাগজে বই ছাপার কৌশল নিচ্ছে। মাধ্যমিক স্তরে বই ছাপানোর জন্য প্রয়োজন ৬৫ হাজার টন কাগজ। সিন্ডিকেট চক্র কাগজের টনপ্রতি ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা কমিশন বাণিজ্য করছে। শুধু মাধ্যমিক স্তরেই তারা ৪৫ কোটি টাকা কমিশন আয় করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মুদ্রার অপর পিঠ
দেশে শত শত পেপার মিল থাকলেও এনসিটিবি মাত্র পাঁচটি মিল ছাড়া অন্য সব মিলের কাগজ অনুমোদন দিচ্ছে না। প্রেস মালিকদের মতে, সব মিল থেকে কাগজ কেনার সুযোগ দিলে কাগজের দাম টনপ্রতি ১ লাখ ১০ হাজারের নিচে নেমে আসবে, যা বর্তমানে ১ লাখ ১৫ থেকে ১ লাখ ১৭ হাজার টাকার মধ্যে। এনসিটিবির সচিব, ভান্ডার কর্মকর্তা এবং অন্যান্য কর্মকর্তারা এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
দুর্নীতি দমনের জিজ্ঞাসাবাদ অসম্পূর্ণ
গত বছর একই ধরনের কেলেঙ্কারি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান করে। তখন বহু প্রেস মালিক জিজ্ঞাসাবাদে আসে এবং কাগজ ক্রয়ে দুর্নীতির তথ্য মেলে। কিন্তু এই দুর্নীতিতে সরাসরি যুক্ত থেকেও এনসিটিবির তৎকালীন চেয়ারম্যান রিয়াজুল হাসান এবং সদস্য ড. রিয়াদ চৌধুরী ছাড় পান। ড. রিয়াদ চৌধুরী এখনও বহাল তবিয়তে এনসিটিবিতে কাজ করছেন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাকে সরানোর জন্য ৯ বার ফাইল উঠালেও সচিবের দপ্তরের একজন কর্মকর্তা তা আটকে রেখেছেন।










