গ্ল্যামারের দুনিয়া বাইরে থেকে যতটা ঝলমলে ও স্বপ্নময় মনে হয়, ভেতরে টিকে থাকা ততটাই কঠিন—বিশেষ করে একজন অভিনেত্রীর জন্য। সৌন্দর্য, প্রতিভা আর পরিশ্রম থাকা সত্ত্বেও প্রত্যাখ্যান, অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ পেরিয়ে যেতে হয় বহু শিল্পীকে। কারিশমা তান্নার জীবন সেই কঠিন বাস্তবতারই এক নীরব কিন্তু দৃঢ় উদাহরণ। উচ্চতার কারণে বারবার কাজ হারানো, দীর্ঘ সময় অফস্ক্রিন থাকা এবং মানসিক অবসাদের সঙ্গে লড়াই করেও তিনি থেমে যাননি।
২১ ডিসেম্বর জন্মদিন কারিশমা তান্নার। ছোটবেলায় অভিনেত্রী হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না তাঁর। কলেজজীবনে পড়াশোনার পাশাপাশি স্বাভাবিক জীবনই কাটছিল। বন্ধুদের অনুরোধে একদিন একটি ফটোশুটে অংশ নেন তিনি। নিজেও জানতেন না, সেই ছবি বন্ধুরা বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়ে দেবে। সেখান থেকেই হঠাৎ করেই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। একের পর এক মডেলিংয়ের কাজের প্রস্তাব আসতে শুরু করে, আর ধীরে ধীরে তিনি ঢুকে পড়েন বিনোদন জগতের আলোয়।
একটি ফোনকলই পুরো জীবন বদলে দেয় কারিশমার। বালাজি টেলিফিল্মস থেকে ডাক পান তিনি। অল্প সময়ের মধ্যেই সুযোগ আসে জনপ্রিয় টিভি সিরিয়াল ‘কিউঁকি সাস ভি কভি বহু থি’-তে অভিনয়ের। এই ধারাবাহিকের মাধ্যমে তিনি ঘরে ঘরে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। এরপর ‘কই দিল মে হ্যায়’, ‘এক লড়কি অঞ্জানি সি’ ও ‘পেয়ার কে দো নাম: এক রাধা, এক শ্যাম’-এর মতো একাধিক সিরিয়ালে কাজ করে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন।
তবে সাফল্যের এই পথ কখনোই মসৃণ ছিল না। কারিশমা নিজেই বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তাঁর লম্বা গড়নই অনেক সময় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই সময় টেলিভিশনে অভিনেত্রীদের জন্য যে নির্দিষ্ট শারীরিক কাঠামো জনপ্রিয় ছিল, তিনি তার সঙ্গে পুরোপুরি মানানসই ছিলেন না। ফলে বহু প্রধান চরিত্র হাতছাড়া হয়, আটকে যেতে হয় পার্শ্বচরিত্রে। এই প্রত্যাখ্যান তাঁকে মানসিকভাবে ভীষণভাবে আঘাত করেছিল।
টেলিভিশনে পরিচিতি পাওয়ার পর কারিশমা চেষ্টা করেন বলিউডে নিজের জায়গা করে নিতে। ২০১৩ সালে ‘গ্র্যান্ড মস্তি’ দিয়ে সিনেমায় অভিষেক হয় তাঁর। এরপর ‘টিনা অ্যান্ড লোলো’ এবং রণবীর কাপুর অভিনীত আলোচিত ছবি ‘সঞ্জু’-তে ছোট হলেও চোখে পড়ার মতো চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। ‘সঞ্জু’ বক্স অফিসে বিশাল সাফল্য পেলেও আশ্চর্যজনকভাবে সেই সাফল্য তাঁর ক্যারিয়ারে বড় কোনো সুযোগ এনে দেয়নি। বরং ছবিটির পর প্রায় এক বছর কাজহীন সময় পার করতে হয় তাঁকে।
এই সময়টাই ছিল কারিশমা তান্নার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়। একের পর এক প্রোডাকশন হাউসে যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া না পাওয়া, ইন্ডাস্ট্রিতে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর অভাব—সব মিলিয়ে তিনি মানসিক অবসাদে ভুগতে শুরু করেন। কাজ না থাকার হতাশা তাঁকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল।
তবে ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নেন কারিশমা। বাহ্যিক স্বীকৃতির বদলে নিজের মানসিক শক্তি, ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাসের ওপর ভরসা রাখেন তিনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওটিটি ও ওয়েব সিরিজের দুনিয়ায় নতুন সম্ভাবনা খুঁজে পান। ‘হাশ হাশ’ সিরিজে একজন পুলিশ অফিসারের চরিত্রে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়। নতুন এই মাধ্যমেই কারিশমা তান্না আজ নিজের নতুন পরিচয় গড়ে তুলছেন—সংগ্রাম পেরিয়ে পাওয়া এক পরিণত, আত্মবিশ্বাসী শিল্পীর পরিচয়।
বিথী রানী মণ্ডল/










