দস্যু আতঙ্কে পেশা বদলাচ্ছেন সুন্দরবনের বনজীবীরা, বাড়ছে অনিশ্চয়তা

দস্যু আতঙ্ক, অপহরণ ও প্রাণহানির ভয়ে সুন্দরবনের হাজারো বনজীবী এখন পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন। একসময় যারা জীবিকার তাগিদে বনের গভীরে গিয়ে মাছ ধরা, মধু সংগ্রহ, কাঁকড়া ও গোলপাতা আহরণ করতেন, তারা এখন জীবনের নিরাপত্তা খুঁজে বিকল্প পেশায় ঝুঁকছেন।

গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সুন্দরবনে দস্যুদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় বননির্ভর জীবিকা হয়ে উঠেছে চরম ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে অনেক জেলে ও বাওয়ালি বনে যাওয়া বন্ধ করে ভ্যান চালানো, দিনমজুরি, ইটভাটার শ্রমিক কিংবা শহরে কারখানার কাজে যুক্ত হচ্ছেন।

শৈশব থেকেই সুন্দরবনে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন জেলে রায়হান শেখ। দস্যু আতঙ্কে এখন আর বনে যান না তিনি। কর্মসংস্থানের অভাবে পরিবার নিয়ে ঢাকায় চলে গিয়ে একটি কারখানায় শ্রমিকের কাজ করছেন। তিনি বলেন, “জীবনের অর্ধেক সময় বনে কাটিয়েছি। কিন্তু এখন বনে গেলে জীবিত ফিরব কি না—সেই নিশ্চয়তা নেই।”

একই বাস্তবতার কথা জানান কয়রার বনজীবী সাফিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, “মুক্তিপণ দিয়ে যে আয় হয়, তাতে সংসার চালানো অসম্ভব। এলাকায় কাজ না থাকায় ধান কাটার মৌসুমি কাজে বাইরে যেতে হচ্ছে।”

আরেক বনজীবী আব্দুল জলিল (ছদ্মনাম) জানান, একবার দস্যুদের হাতে আটক হয়ে মুক্তিপণ দেওয়ার পর আর বনে যান না। বর্তমানে তিনি ইটভাটায় কাজ করছেন।

নির্যাতনের শিকার বনজীবীরা

সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করতে গিয়ে দুই বনজীবী আ. সালাম ও আকবর আলী দস্যু জাহাঙ্গীর বাহিনীর হাতে আটক হন। মুক্তিপণের জন্য তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। বর্তমানে তারা চিকিৎসাধীন।

ভুক্তভোগী আকবর আলী বলেন, আগে থেকেই টাকা পরিশোধ করলেও তাকে মারধর করা হয় এবং একপর্যায়ে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। পরে সহকর্মীরা অতিরিক্ত টাকা দিয়ে তাকে উদ্ধার করেন। আ. সালাম জানান, সুযোগ বুঝে দস্যুদের কবল থেকে পালিয়ে দীর্ঘ পথ হেঁটে একটি ফরেস্ট ক্যাম্পে পৌঁছান। পরে পরিবারের সহায়তায় তিনি বাড়ি ফিরতে সক্ষম হন।

দস্যুদের তৎপরতা ও আতঙ্ক

সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রা, দাকোপ ও শ্যামনগর এলাকায় বনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকার পতনের পর জেল থেকে পালিয়ে আসা সশস্ত্র দস্যুরা আবার বনে সক্রিয় হয়েছে। গত এক বছরে শতাধিক জেলেকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আত্মসমর্পণ করা কিছু বাহিনী আবারও দস্যুতায় ফিরেছে। পশ্চিম সুন্দরবনে মজনু বাহিনী, শরীফ বাহিনী, দয়াল বাহিনী, জাহাঙ্গীর বাহিনীসহ একাধিক দস্যু দলের তৎপরতা বেড়েছে।

রাজস্ব আদায়ে ধস

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দস্যু আতঙ্কে আগের মতো জেলেরা বনে প্রবেশ না করায় সরকারের রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। চলতি মাসে বিভিন্ন স্টেশন থেকে যে সংখ্যক নৌকা বনে প্রবেশ করেছে, তা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অর্ধেকেরও কম।

উল্লেখ্য, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ৩২টি দস্যু বাহিনীর ৩২৮ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করলে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়। তবে বর্তমানে সেই চিত্র আর নেই।

সমন্বিত উদ্যোগের দাবি

কয়রা কপোতাক্ষ কলেজের সাবেক অধ্যাপক আ.ব.ম আব্দুল মালেক বলেন, “দস্যু দমন ও বিকল্প জীবিকার সুযোগ না থাকলে এই জনগোষ্ঠী আরও পিছিয়ে পড়বে। সরকার ও এনজিওদের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।”

স্থানীয় সামাজিক সংগঠনের নেতারাও বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

বন বিভাগের বক্তব্য

এ বিষয়ে খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, “সুন্দরবনে জেলে অপহরণের ঘটনা ঘটছে এবং মাঝে মাঝে দস্যুদের সঙ্গে গোলাগুলিও হচ্ছে। বন বিভাগের একার পক্ষে দস্যু দমন সম্ভব নয়। র‍্যাব, কোস্টগার্ড ও বিজিবির সঙ্গে সমন্বয়ে দ্রুত যৌথ অভিযান শুরু করা হবে।”

এমইউএম/