চট্টগ্রাম ১৪ আসনে বিতর্কের ঝড়

চট্টগ্রাম ১৪ আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নতুন করে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে এই আসন থেকে প্রার্থী হওয়া জসিম উদ্দীন আহমদের বিরুদ্ধে ঋণ খেলাপি তথ্য গোপন,জুলাই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সংশ্লিষ্টতা এবং গুরুতর নৈতিক স্খলনের অভিযোগ এনে তার মনোনয়ন বাতিল ও দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপি প্রদান করেছে একটি সংগঠন।

বুধবার (১৪ জানুয়ারি)সচেতন ছাত্র-জনতা চট্টগ্রাম ব্যানারে দেওয়া এই স্মারকলিপিতে বলা হয়,জুলাই বিপ্লবে শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে কেউ সংসদ সদস্য হওয়ার অধিকার রাখে না।অভিযোগগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দ্রুত ও কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করা হয়।

স্মারকলিপিটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবর জমা দেন জুলাইযোদ্ধা সাইফুদ্দীন মুহাম্মদ এমদাদ (গ্যাজেটপ্রাপ্ত)।এতে বলা হয়,জসিম উদ্দীন আহমদ একজন বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ ব্যক্তি যিনি ইচ্ছাকৃতভাবে আইন লঙ্ঘন করে নির্বাচনে অংশগ্রহণের চেষ্টা করছেন।

স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়,জসিম উদ্দীন আহমদ জুলাই বিপ্লব চলাকালে সংঘটিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র শহীদ হৃদয় তরুয়া হত্যা মামলার (এজাহার নং ৬২)একজন তালিকাভুক্ত আসামি।একই সঙ্গে জুলাই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও চারটি হত্যা মামলায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করা হয়।

স্মারকলিপিতে বলা হয়,একাধিক হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত কোনো ব্যক্তি নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে জাতীয় সংসদের সদস্য হওয়ার যোগ্যতা রাখেন না। ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা নতুন বাংলাদেশে এমন একজন ব্যক্তির প্রার্থী হওয়া শহীদদের প্রতি চরম অবমাননার শামিল।

স্মারকলিপিতে আরও দাবি করা হয়,জসিম উদ্দীন আহমদ এবং তার মালিকানাধীন একাধিক প্রতিষ্ঠান কয়েক শত কোটি টাকার ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপি।পদ্মা ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্যে এই ঋণ খেলাপির বিষয়টি উঠে এসেছে বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগ করা হয়,জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য দাখিল করা হলফনামায় তিনি এই বিপুল অংকের ঋণ খেলাপির তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করেছেন, যা নির্বাচন আইন ও আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এই প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনের কাছে তার CIB (Credit Information Bureau) রিপোর্ট পুনরায় যাচাই করার জোর দাবি জানানো হয়।

স্মারকলিপিতে জসিম উদ্দীন আহমদের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরা হয়।এতে বলা হয়,তিনি সাবেক পলাতক ও বহুল আলোচিত বিতর্কিত আইজিপি বেনজীর আহমেদ-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদের অবৈধ উপার্জিত অর্থ ব্যবস্থাপনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত কালো টাকা, অর্থ পাচার এবং অবৈধ আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে ধরে স্মারকলিপিতে বলা হয়, এমন একজন ব্যক্তির সংসদ সদস্য হওয়া রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সুশাসনের জন্য হুমকিস্বরূপ।

একাধিক হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হয়েও প্রকাশ্যে নির্বাচনী কার্যক্রম চালানোর বিষয়টি নিয়েও স্মারকলিপিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, প্রশাসনের চোখের সামনে একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্বাচনী প্রচারণা চালালে আইনের শাসনের ওপর জনগণের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়।

স্মারকলিপিতে স্পষ্ট ভাষায় দাবি করা হয়,জসিম উদ্দীন আহমদকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা না হলে জুলাই বিপ্লবের শহীদদের আত্মত্যাগ অর্থহীন হয়ে পড়বে।

 

স্মারকলিপিতে নির্বাচন কমিশনের কাছে তিনটি নির্দিষ্ট দাবি জানানো হয় ১. জসিম উদ্দীন আহমদের মনোনয়নপত্র অবিলম্বে বাতিল করা।২. ঋণ খেলাপি ও হলফনামায় তথ্য গোপনের অভিযোগ তদন্ত করে তাকে নির্বাচনী অযোগ্য ঘোষণা করা।৩. তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া হত্যা ও অন্যান্য ফৌজদারি মামলার প্রেক্ষিতে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া।

এই স্মারকলিপিকে ঘিরে চট্টগ্রাম ১৪ আসনের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়ভাবে বিষয়টি নিয়ে সাধারণ ভোটার, ছাত্রসমাজ এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।অনেকেই বলছেন,অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে।

অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, হত্যা মামলা ও ঋণ খেলাপির মতো গুরুতর অভিযোগ থাকলে নির্বাচন কমিশনের উচিত দ্রুত যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করা। নচেৎ একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন আয়োজনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাদের মতে, এই ধরনের অভিযোগের নিষ্পত্তি শুধু একটি আসনের বিষয় নয়, বরং পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে জড়িত।

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি