প্রকল্পের কাজ শেষ, তবু ঠিকাদারের টাকায় যুক্তরাষ্ট্রে চট্টগ্রাম ওয়াসার তিন কর্মকর্তা

নগরীর চান্দগাঁও ও আগ্রাবাদ এলাকায় তিন হাজার স্মার্ট মিটার স্থাপনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম ওয়াসার ডিজিটাল মিটার প্রকল্পের পাইলট কার্যক্রম শুরু হয়। ২০২২ সালে প্রায় ৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ব্যয়ে নেওয়া এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় লাগে। চলতি বছরের মে মাসে প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন হয় এবং বর্তমানে বিলিং কার্যক্রম চলছে। অথচ কাজ শেষ হওয়ার পর এখন কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণে পাঠানোয় প্রশ্ন উঠেছে এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে।

নন-টেকনিক্যাল কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ!

প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া তিন কর্মকর্তার মধ্যে কেবল একজন সরাসরি সফটওয়্যার কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। বাকি দুজন ভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ মাহবুবুল আলম বলেন, তার নাম চট্টগ্রাম ওয়াসা থেকে পাঠানো হয়েছে, তাই তিনি যাচ্ছেন। প্রশিক্ষণের বিস্তারিত বিষয় সম্পর্কে তিনি নিজেও অবগত নন।

একই বক্তব্য দেন প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রুমন দে। তিনি জানান, ডিজিটাল মিটার কার্যক্রমের সঙ্গে তার সরাসরি কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নাম নির্বাচিত করায় তিনি সফরে যাচ্ছেন।

প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশ উপেক্ষা

ঠিকাদার বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। গত ২৩ মার্চ জারি করা এক পরিপত্রে এ ধরনের সফর পরিহারের নির্দেশ দেওয়া হয়। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া উপদেষ্টা বা সচিবদের সফরসঙ্গী নেওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করাও নিষিদ্ধ করা হয়। তবে এসব নির্দেশনা উপেক্ষা করেই ঠিকাদারের অর্থায়নে ১৫ দিনের যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন ওয়াসার কর্মকর্তারা।

ওয়াসার একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঠিকাদারের টাকায় বিদেশ সফর করলে ভবিষ্যতে পণ্যের মান ও প্রকল্প তদারকিতে আপসের ঝুঁকি তৈরি হয়। সুবিধা নেওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের কাজেও নীরব থাকতে হয়।

উগান্ডা সফরের পুনরাবৃত্তি?

চট্টগ্রাম ওয়াসার বিদেশ সফর বিতর্ক নতুন নয়। ২০১৯ সালে ২৭ জন কর্মকর্তা প্রশিক্ষণের নামে উগান্ডা সফর করে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। সেই ঘটনার পরও একই ধরনের চর্চা অব্যাহত থাকায় প্রশ্ন উঠেছে সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা নিয়ে।

গ্রাহকদের ভোগান্তি চরমে

ডিজিটাল মিটার স্থাপনের পর থেকে অনেক গ্রাহক অভিযোগ করেছেন, আগের তুলনায় চার গুণ পর্যন্ত বেশি বিল আসছে। কোথাও আবার অস্বাভাবিকভাবে কম বিল পাওয়া যাচ্ছে। অভিযোগ দিয়েও সমাধান না পেয়ে গ্রাহকদের ক্ষোভ বাড়ছে। অনেকেই আগের মিটার পুনঃস্থাপনের দাবি জানালেও ওয়াসা তা নাকচ করেছে।

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ প্রকল্প

পাইলট প্রকল্পের এই অভিজ্ঞতার মধ্যেই বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আরও প্রায় এক লাখ স্মার্ট মিটার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসার। তবে বর্তমান প্রকল্পের ত্রুটি, রিডিং সমস্যা ও গ্রাহক অসন্তোষের কারণে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

চট্টগ্রাম ওয়াসার কম্পিউটার প্রোগ্রামার লুৎফি জাহান জানান, কিছু মিটারে কারিগরি ত্রুটি রয়েছে, যা ওয়ারেন্টির আওতায় প্রতিস্থাপন করা হবে। তবে মাঠপর্যায়ে গ্রাহকদের ভোগান্তি ও বিলিং জটিলতা এখনো কাটেনি।

এই পরিস্থিতিতে ঠিকাদারের খরচে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর সচেতন মহলে ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।

এমইউএম/