আধুনিক জীবনে ঘুমের সমস্যা একটি ব্যাপক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাপী প্রায় তিনজন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজন অনিদ্রার লক্ষণে ভোগেন, যা মেজাজের ব্যাধি, মনোযোগের অভাব এবং স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা ডেকে আনে।
এই সমস্যার একটি সহজ এবং কার্যকর সমাধান হতে পারে ঘুমানোর আগে রাতে হাঁটা।
‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট’য়ের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারজানা রহমান দিনা এ বিষয়ে বিস্তারিত পরামর্শ দিয়েছেন।
তার মতে, নিয়মিত হাঁটা শুধু শারীরিক স্বাস্থ্যই নয়, ঘুমের মানও উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করে।
প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিনিট হাঁটা দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য উপকারিতা বয়ে আনে।
ডা. দিনা বলেন, “নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ে।”
হাঁটা একটি অ্যারোবিক ব্যায়াম, যা খারাপ কোলেস্টেরল কমায়, ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, রক্তে শর্করার মাত্রা হ্রাস করে, হাড়ের জোড় রক্ষা করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।
এছাড়া এটি মানসিক চাপ ও উত্তেজনা হ্রাস করে, ‘এন্ডোরফিনস’ হরমোন নিঃসরণের মাধ্যমে মেজাজ উন্নত করে এবং ঘুমের মান বাড়ায়।
বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে হাঁটা অনিদ্রার বিরুদ্ধে কার্যকর।
আধুনিক জীবনে ক্যাফিনের অত্যধিক সেবন, স্ক্রিনের নীল আলোর দীর্ঘক্ষণ ‘এক্সপোজার’ বা ঘুমের আগে ভারী খাবার— এসব অনিদ্রার কারণ।
এছাড়া দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, শ্বাসকষ্ট বা রাতে প্রস্রাবের জন্য জেগে ওঠা ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়।
রাতে হাঁটা দ্রুত ঘুম পাড়ায় এবং ঘুমের মান ও সময়কাল উন্নত করে।
অন্ধকারে হাঁটলে কৃত্রিম আলো থেকে দূরে থাকা যায়, যা মেলাটোনিন হরমোনের উৎপাদন বাড়ায়। এটি শরীরকে চাপ কমানোর সংকেত দেয় এবং প্যারাসিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্রকে সক্রিয় করে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করে।
রাতে হাঁটার সুবিধা সর্বোচ্চ করতে কয়েকটি নিয়ম মেনে চলা জরুরি। প্রথমত, হাঁটাকে হালকা ও শান্তিপূর্ণ রাখুন। তীব্র ব্যায়াম শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে ঘুমে বিলম্ব ঘটাতে পারে, যা দিনের শুরুতে উপযুক্ত। রাতে হাঁটা শুধু শিথিলতার জন্য- জানান এই চিকিৎসক।
নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
একা হাঁটার পরিবর্তে সঙ্গী নিন— এটি মানসিক সুস্থতা বাড়ায় এবং একাকিত্ব কমায়।
পরিবার বা প্রিয়জনকে নিজের অবস্থান জানান এবং ট্র্যাক করার সুযোগ দিন। পরিচিত পথ বেছে নিন, যেখানে ঝোপঝাড় বা অন্ধকার কম।
প্রতিফলিত পোশাক ও জুতা পরুন, যাতে গাড়িচালকরা সহজে দেখতে পান। প্রয়োজনে আলো ব্যবহার করুন।
ফুটপাতে হাঁটুন এবং যানবাহনের বিপরীত দিকে থাকুন, যাতে গাড়ি দেখতে পান।
হেডফোন এড়িয়ে চলুন। কারণ সংগীত বা পডকাস্ট মনোযোগ ভাঙতে পারে এবং রাতে বিপদ ডেকে আনতে পারে। এছাড়া, গান মাথায় আটকে থেকে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, হাঁটার বিষয়টা ঘুমানোর অন্তত দেড় ঘণ্টা আগে শেষ করুন।
হাঁটার পর শরীরের মূল তাপমাত্রা স্বাভাবিক হতে প্রায় ৯০ মিনিট লাগে। এই সময়ে গোসল করুন, ঘুমের প্রস্তুতি নিন এবং উজ্জ্বল আলো, টেলিভিশন বা স্ক্রিন থেকে দূরে থাকুন— যাতে মেলাটোনিনের প্রভাব নষ্ট না হয়।
ডা. দিনা বলেন, “রাতে হাঁটা একটি সহজ অভ্যাস, যা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অসাধারণ উপকারী।”
এটি চেষ্টা করে দেখুন— শান্তিপূর্ণ এবং গভীর ঘুমের অভিজ্ঞতা পাবেন নিশ্চয়ই। নিয়মিত এই অভ্যাস গড়ে তুললে জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।
এম এম/










