দাওয়াত একটি আরবী শব্দ, যার অর্থ ডাকা, আহবান করা। ইসলামের দাওয়াতের সারকথা হচ্ছে, মানুষকে দুনিয়ার শান্তি ও আখিরাতের মুক্তির দিকে আহবান করা।
ইসলামের আবির্ভাব শুধু ব্যক্তির কল্যাণের জন্য নয়; সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের জন্য ইসলাম। আর ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের সৌভাগ্য দুটি বিষয়ের উপর নির্ভরশীল : সালাহ ও ইসলাহ। অর্থাৎ নিজে সংশোধন হওয়া এবং অন্যকে সংশোধন করা। দাওয়াতের কাজ ছাড়া যা কখনো সম্ভব নয়।
দাওয়াতি কাজের গুরুত্ব ও ফযীলত এত অধিক, যা কোনো মানুষ বাহ্যিক দৃষ্টিতে অনুধাবন করতে পারে না। পবিত্র কালামের অসংখ্য আয়াত যার উজ্জ্বল সাক্ষী। আল্লাহ তাআলা বলেন,
‘ঐ ব্যক্তির কথার চেয়ে কার কথা উত্তম হ’তে পারে, যে আল্লাহর পথে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে যে, নিশ্চয়ই আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত। সৎকর্ম ও অসৎকর্ম সমান নয়। প্রতুত্তর নম্রভাবে দাও, দেখবে তোমার শত্রুও অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে পরিণত হয়েছে’ (হা-মীম সিজদা ৩৩-৩৪)।
আয়াতে দাওয়াতের গুরুত্ব সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে। দাওয়াত এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ, যার বিনিময়ে মানুষ সবচেয়ে উত্তম হ’তে পারে। এর ফলে পারষ্পরিক শত্রুতা দূরীভূত হয় এবং বন্ধুত্ব ফিরে আসে।
পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বভাব ও ভালবাসার সৃষ্টি হয়।
দাওয়াত প্রদানের পদ্ধতি :
দাওয়াত প্রদানের পদ্ধতি সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহবান কর প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সাথে বিতর্ক কর সুন্দর পন্থায়’ (সুরা নাহল ১৬/১২৫)।
এ আয়াতে দাওয়াতের তিনটি পদ্ধতি উল্লিখিত হয়েছে। যথা-
(১) হিকমত তথা পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ ভিত্তিক দাওয়াত দেওয়া।
(২) উত্তম উপদেশ দেওয়া।
(৩) উত্তম পন্থায় বিতর্ক করা।
আল্লাহ আরো বলেন, ‘কালের শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ অবশ্যই ক্ষতির মধ্যে নিপতিত। তবে তারা ব্যতীত, যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, পরস্পরকে হকের উপদেশ দেয় এবং পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দেয়’ (আছর ১০৩/১-৩)।
আল্লাহর পথে দাওয়াত দানকারীর যেসব গুণাবলী থাকা আবশ্যক :
সত্যবাদী হওয়া : আল্লাহর পথের দাঈকে অবশ্যই সত্যবাদী হ’তে হবে। দাঈর মধ্যে যদি মিথ্যার লেশমাত্র পাওয়া যায় তাহ’লে তার দাওয়াত ফলপ্রসু হবে
ধৈর্যশীল হওয়া : ধৈর্য মহৎ গুণ। আল্লাহর পথের দাঈদের এই মহৎ গুণে গুণান্বিত হ’তে হবে। নচেৎ দাওয়াত দানে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে না। কেননা আল্লাহর রাস্তায় দাওয়াত দিতে গেলে অনেক বিপদ আসতে পারে, সেক্ষেত্রে ধৈর্যের সাথে তা মোকাবিলা করতে হবে।
কোমল স্বভাবের অধিকারী হওয়া : নম্রতা-ভদ্রতা ও কোমলতা আদর্শ মানুষের গুণ। দ্বীনের দাঈর মধ্যে অবশ্যই এ গুণ থাকা বাঞ্ছনীয়। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে কোমলতা অর্জনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফেরাঊনের সাথে কোমল আচরণের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা মূসা ও হারূণ (আঃ)-এর উদ্দেশ্যে বলেন, ‘তোমরা উভয়ে ফেরাউনের নিকটে যাও, নিশ্চয়ই সে সীমালংঘণ করেছে। অতঃপর তার সাথে নম্র ভাষায় কথা বল। সম্ভবতঃ সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভীতি অবলম্বন করবে’ (ত্ব–হা ৩৯/৪৩–৪৪)।,
দ্বীনী কাজে একনিষ্ঠ হওয়া : দ্বীনি কাজে একনিষ্ঠতা ব্যতীত কখনও দাওয়াতী কাজে সফলতা আসবে না। আর ইখলাছ বা একনিষ্ঠতা হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাজ করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘বল, আমি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর ইবাদত করতে আদিষ্ট হয়েছি’ (যুমার ৩৯/১১)।
কথায় ও কাজে মিল থাকা : আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা এমন কথা কেন বল যা নিজেরা কর না? তোমরা যা কর না তা বলা আল্লাহর দৃষ্টিতে অতিশয় অসন্তোষজনক’ (ছফ ৬১/২–৩)।
রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘যখন আমাকে মে‘রাজের রাতে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন আমি কিছু লোককে দেখলাম, যাদের ঠোঁট আগুনের কাঁচি দ্বারা কেটে দেওয়া হচ্ছে। আমি বললাম, হে জিব্রীল! এরা কারা? তিনি বললেন, তারা আপনার উম্মতের বক্তাগণ, যারা মানুষকে ভাল কাজের জন্য আদেশ করত এবং নিজেদেরকে ভুলে যেত, অথচ তারা কুরআন তেলাওয়াত করত। কিন্তু তারা চর্চা করত না’।[9]
মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে দিনের দাওয়াত দেয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন










