ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন: সহিংসতা, উত্তেজনা ও ভোটের ভবিষ্যৎ
দেশজুড়ে নির্বাচনী উত্তেজনা তীব্র হচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলো মাঠে–ময়দানে প্রচারণা, রোডম্যাপ ও কৌশল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। ১১ ডিসেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার তফসিল ঘোষণা করেন। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, মনোনয়ন জমার শেষ দিন ২৯ ডিসেম্বর, বাছাই ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত, আপিল ৫ থেকে ৯ জানুয়ারি, নিষ্পত্তি ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি, প্রার্থিতা প্রত্যাহার ২০ জানুয়ারি এবং প্রতীক বরাদ্দ ২১ জানুয়ারি। ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত।
নির্বাচন কমিশন বলছে, এবার স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে পুরো নির্বাচন সম্পন্ন হবে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যবেক্ষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। নিরাপত্তা জোরদার এবং সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হবে।
তবে রাজনৈতিক তাপমাত্রা দিন দিন বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রভাব বিস্তার, মিছিল-মিটিংয়ের অনুমতি নিয়ে জটিলতা, গ্রামাঞ্চলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই এবং প্রচারণার বাধা–এমন অভিযোগ উঠছে। দলীয় কর্মী এবং সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।
সহিংসতার ঘটনাগুলো উদ্বেগ বাড়াচ্ছে
নির্বাচনী উত্তাপ বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক সহিংস ঘটনা দেশে নতুন প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে। হাদি হত্যার পর বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, গণপরিবহনে আগুন, দোকানপাট ভাঙচুর, বাড়িঘরে হামলার ঘটনাও ঘটে। এরপর প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা, সংখ্যালঘু যুবককে গণপিটুনির পর ঝুলিয়ে পুড়িয়ে হত্যা, এনসিপি নেতার মাথায় গুলিসহ বেশ কয়েকটি ঘটনার প্রেক্ষিতে ভোটার, সাধারণ নাগরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
গ্রামের সাধারণ মানুষ নির্বাচনী সহিংসতার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী বলে গবেষকরা মনে করেন। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজনৈতিক চাপ, ক্ষমতাবানদের প্রভাব ও সামাজিক প্রতিশোধের আশঙ্কায় ভোটকেন্দ্র পর্যায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে।
মনোনয়ন নিয়ে উত্তেজনা
মনোনয়ন জমা এবং বাছাই সামনে আসতেই দলগুলোর ভেতরে কোন্দল বাড়ছে। স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থী নিয়ে দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার কেন্দ্র দখলের প্রতিযোগিতা, আওয়ামী লীগ–বিএনপি কিংবা জোটভিত্তিক বিরোধের পাশাপাশি একই দলের ভেতরেও মতবিরোধ দেখা গেছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়ছেন।
বিএনপি ইতোমধ্যে ২৭২ আসনের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। দলটির অনেক নেতাকর্মী বলেন, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তই মনোনয়ন নির্ধারণ করবে। এনসিপি ১২৫ আসনে প্রার্থী দিয়েছে। জাতীয় পার্টি বলছে, তারা ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় নারী, সংখ্যালঘু ও তরুণ প্রতিনিধিত্ব এখনও কম—এমন অভিযোগ তুলছে সুশীল সমাজ। নারীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি অংশগ্রহণ সীমিত করছে।
মাঠে প্রচারণা, আশঙ্কা ভর করেছে।
তফসিল ঘোষণার পর থেকেই বিভিন্ন দলে দলীয় প্রচারণা, মানববন্ধন, গণসংযোগ, ভোট চাওয়ার কাজে নেতাকর্মীরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণাও তীব্র হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা অভিযোগ করছেন, প্রচারণার স্বাধীনতা সমান নয়। বিরোধী দলের সমাবেশে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না বা সীমিত করা হচ্ছে, আবার শাসক দলের প্রচারণায় প্রশাসন সহায়তা করছে।
এমন অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন বলছে, অনুমতি বা সীমাবদ্ধতার কারণ নিরাপত্তা সংক্রান্ত।
ভোটারদের সন্দেহ
ভোটার আচরণে এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরাপত্তা। তারা প্রশ্ন করছেন, বাহিরে এসে ভোট দিতে গেলে হামলার শিকার হতে পারেন কি না। গত কয়েক নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় ভোটদানে আগ্রহ কমেছে।
এক নারী বলেন,
“আমরা ভোট দিই, কিন্তু পরে হামলা হয়। এবার গেলে নিরাপত্তা কি থাকবে?”
এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন,
“ভোট দিতে চাই, কিন্তু ফল আগেই ঠিক থাকে না তো!”
বিশ্লেষকরা কী বলছেন?
SONEKA–র নির্বাহী পরিচালক মোশাররেফা মোহাম্মদ বলেন,
“সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও পর্যবেক্ষকদের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে নির্বাচনের বৈধতা এবং গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রাশেদ আলম ভূঁইয়া বলেন,
“নির্বাচন কমিশনের আইনগত ক্ষমতা থাকলেও জনগণের perception–এ এর নিরপেক্ষতা দুর্বল। ফলাফল চাইলে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠন জরুরি।”
প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে দ্বিধা
নির্বাচন সামনে রেখে প্রশাসনের আচরণ নিয়ে বিভিন্ন উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ—ফিল্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাচনী মাঠে চাপ ও প্রভাবের মুখে থাকে, ফলে বিরোধী প্রচারণা বাধাগ্রস্ত হয়। জেলা প্রশাসক থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক চাপের মুখে সিদ্ধান্ত নিতে হয়—এমন অভিযোগ রাজনৈতিক মহলে প্রায়শই শোনা যায়।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকবে—এটা প্রত্যাশা। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। অতীত নির্বাচনে কেন্দ্র দখল, এজেন্ট বহিষ্কার, ব্যালট ছিনতাই ও জাল ভোটের অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা শুধু আইনি কাঠামোয় নয়—মাঠপর্যায়ের কর্মীদের আচরণেও প্রতিফলিত হওয়া জরুরি।
এক সাবেক রিটার্নিং কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“নিরপেক্ষতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ভোটের দিন নয়; আসলে মনোনয়ন যাচাই, মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তা, নির্বাচন–পূর্ব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ এবং ভোট–পরবর্তী প্রতিশোধ ঠেকানো।”
নির্বাচন-পূর্ব গুজবের ঝড়
সোশ্যাল মিডিয়ার বিস্তার নির্বাচনের বাস্তবতাকে আরও জটিল করেছে। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে রাজনৈতিক বিভাজন, ভুল খবর, গুজব, মনগড়া তত্ত্ব, ভয়–উত্তেজনা তৈরি অভিযোগ বাড়ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা মনে করেন, নির্বাচন সামনে রেখে গুজব রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে। এতে দুই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়—
১) ভোটার নিরুৎসাহিত হয়
২) নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা প্রার্থীর বিরুদ্ধে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সাইবার মনিটরিং ইউনিট গঠন করা হবে এবং ভুয়া প্রচারণা শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এ ধরনের ইউনিট মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হতে পারে, যা গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অংশগ্রহণ অনিশ্চিত
নির্বাচন পর্যবেক্ষণে পশ্চিমা দেশসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। তবে সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে পর্যবেক্ষকদের সংখ্যা সীমিত হতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।
আগের নির্বাচনে পর্যবেক্ষক না থাকা বা সীমিত থাকার কারণে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এবার নির্বাচন কমিশন বলছে, “পর্যবেক্ষকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে।”
তবে কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা জানিয়েছে, মাঠের বাস্তবতা অনুকূল হলে পর্যবেক্ষক পাঠানো হবে; সহিংস পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা: নির্বাচনের অন্তর্নিহিত প্রভাব
এই নির্বাচন এমন সময় অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন দেশের অর্থনীতি চাপে আছে। মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, ব্যাংকিং অনিয়ম, কর্মসংস্থানের অভাব—ভোটারদের মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলতে পারে।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রাশেদ আলম ভূঁইয়া বলেন,
“রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া অর্থনীতি টিকবে না। বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষায় আছে—নির্বাচনের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে কি না।”
ব্যবসায়ী মহলের অনেকে মনে করছেন, সহিংসতা হলে সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হবে এবং বাজারে অস্থিরতা তৈরি হবে। ফলে রাজনৈতিক শান্তি এখন অর্থনৈতিক তাগিদেও জরুরি।
সংখ্যালঘুদের উদ্বেগ বাড়ছে
সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বাংলাদেশের নির্বাচনে ঐতিহাসিকভাবে সহিংসতার শিকার হয়েছে। নির্বাচনের আগে এবং পরে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, লুটপাট, বাড়িঘরে আগুন দেওয়া—এমন অভিযোগ অতীতেও উঠেছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাটি—এক সংখ্যালঘু যুবককে পিটিয়ে হত্যার পর ঝুলিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া—ভোটারদের আতঙ্কে ফেলেছে।
সংখ্যালঘু অধিকারকর্মী আলফাজ উদ্দিন বলেন,
“নিরাপত্তা নিশ্চয়তা না থাকলে সংখ্যালঘু ভোটাররা ভোট দিতে যাবে না। অথচ তাদের অংশগ্রহণ গণতন্ত্র ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য।”
ভোটের মাঠ এখন অনিশ্চয়তার গোলকধাঁধা
দলীয় প্রতিযোগিতা, প্রশাসনিক আচরণ, সহিংসতার ঝুঁকি, গুজব, আন্তর্জাতিক চাপ, অর্থনৈতিক সংকট—সব মিলিয়ে নির্বাচনের বাস্তবতা জটিল হয়ে উঠছে।
একজন উপজেলায় শিক্ষক বলেন,
“নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হলে মানুষ যাবে, প্রার্থী থাকবে, প্রশাসনও কাজ করবে। কিন্তু এখন যে অবস্থায় আছি—সন্দেহ থেকেই যায়।”
রিকশাচালক আনিসুর রহমান বলেন,
“গরিব মানুষ ভোট দেই, কিন্তু পরে যদি ঝামেলা হয়? জীবন আছে আগে।
নির্বাচনী প্রতিযোগিতা ও গণতন্ত্রের সংকট
দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচন কেবল সংখ্যার হিসাব নয়; তা গণতান্ত্রিক বৈধতার উৎস। জনগণের অংশগ্রহণ এবং স্বাধীন ভোটাধিকার নিশ্চিত করা না গেলে নির্বাচন আয়োজন প্রযুক্তিগত আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নেয়।
বিশেষজ্ঞরা একমত যে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা সংকুচিত হলে গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। বিরোধী দলগুলোর সংগঠনিক দুর্বলতা, দলত্যাগ, গ্রেফতার, মামলা, প্রচারণায় বাধা—সব মিলিয়ে মাঠের প্রতিযোগিতার সাম্য প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
SONEKA–র নির্বাহী পরিচালক মোশাররেফা মোহাম্মদ বলেন,
“যখন ভোটের আগেই ফল অনুমানযোগ্য হয়ে যায়, তখন ভোট জনগণের কাছে অর্থ হারায়। প্রকৃত প্রতিযোগিতা থাকলে আস্থা তৈরি হয়, অংশগ্রহণ বাড়ে।”
অপরদিকে কিছু রাজনৈতিক নেতা বলছেন, নির্বাচন প্রতিযোগিতা থাকলে সহিংসতা বাড়ে। তবে রাজনৈতিক বিজ্ঞানীরা মনে করেন, সহিংসতা প্রতিযোগিতার কারণে নয়; বরং প্রতিযোগিতা দমন, বলপ্রয়োগ ও জবাবদিহিহীনতার কারণে।
নির্বাচনোত্তর সহিংসতা : অদৃশ্য আতঙ্ক
বাংলাদেশে অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নির্বাচন–পরবর্তী প্রতিশোধমূলক সহিংসতা ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কেন্দ্র দখল, এজেন্ট বের করে দেওয়া, ভোটারকে ভয় দেখানো—এই পুরোনো কৌশল নির্বাচনোত্তর প্রতিশোধে পাল্টা আকার পায়।
মানবাধিকারকর্মীরা তাই এটিকে long tail violence বলে উল্লেখ করেন—
যেখানে নির্বাচন শেষ হয় ব্যালট দিয়ে, কিন্তু সহিংসতা টিকে থাকে অনেকদিন।
সংখ্যালঘু, নারী, নিম্ন–আয়ের মানুষ এবং ভিন্ন মতাবলম্বীরা এই সহিংসতার সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে থাকে। গ্রামের প্রান্তিক মানুষ ভোট দেয় কিন্তু ভয়ও পোষণ করে।
“ব্যালটের মাধ্যমে নয়—প্রতীকের মাধ্যমে ভোট হয়”
রাজনৈতিক প্রতীকের প্রতি ভোটারদের আবেগ বাংলাদেশের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভোটার অনেকে প্রার্থীকে নয়, দলকে ভোট দেয়।
অনেক ভোটার বলেন,
“প্রতীক দেখেই ভোট দেব। লোক চিনিনা।”
এমন বাস্তবতাও প্রার্থী–ভিত্তিক গণতন্ত্রের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে।
তবে তরুণ ভোটারের আচরণ কিছুটা পরিবর্তন হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব, হতাশা, অর্থনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে তরুণ ভোটাররা বিকল্প নেতৃত্ব খুঁজছে বলে পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের চোখ
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নির্বাচনী পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের রাষ্ট্রদূতেরা বলেছেন, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করা জরুরি।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মোশাররেফা মোহাম্মদ বলেন বলেছেন,
“বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মোড়ে দাঁড়িয়ে। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হলে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রতি আস্থা বাড়বে; সহিংসতা হলে বিপরীত প্রভাব পড়বে।”
অর্থনীতি–রাজনীতি–গণআস্থা
এটি শুধু রাজনৈতিক নির্বাচন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনীতি ও সমাজ। বাজার পরিস্থিতি, খাদ্যদ্রব্যের দাম, কর্মসংস্থানের সংকট—সবই ভোটের আচরণে প্রভাব ফেলবে।
এক ব্যবসায়ী নেতা জুনায়েদ আল হাবিব বলেন,
“বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত সবাই নির্বাচন–পরবর্তী পরিস্থিতি দেখে করবে। অস্থিরতা হলে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া বাজার স্থিতি ফেরানো কঠিন।
প্রশাসনের “দুই মুখ”
রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি অংশ নিরপেক্ষতার ঘোষণা দেয়, কিন্তু মাঠে গিয়ে অনেক সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক পক্ষপাত নির্দেশ করে—এমন অভিযোগ বিরোধীদের।
ঢাকা জেলায় সাংবাদিক মাহমুদুল হাসান বলেন,
“প্রশাসন বলে তারা নিরপেক্ষ। কিন্তু কে সভার অনুমতি পায় আর কে পায় না—সেই তালিকাই বলে দেয় বাস্তবতা কী।”
জেলা প্রশাসকদের ওপর রাজনৈতিক চাপ থাকার অভিযোগ বহু পুরোনো। এবারও সেই অভিযোগ উঠছে।
সহিংসতার “চক্র”
বাংলাদেশের নির্বাচনকে গবেষকেরা তিনটি চক্রে ব্যাখ্যা করেন—
• নির্বাচন-পূর্ব আতঙ্ক
• নির্বাচনকালীন সংঘর্ষ
• নির্বাচনোত্তর প্রতিশোধ
এ তিন স্তরের সহিংসতা থেকে মানুষ এ বছর কতটা নিরাপদ থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন জাগছে।
কমিশনের বড় চ্যালেঞ্জ
প্রশাসনিক সক্ষমতা নয়; সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—
• জনগণের আস্থা
• আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা
• তথ্যপ্রবাহের স্বাধীনতা
নির্বাচন কমিশন বলেছে,
“গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বজায় রেখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।”
তবে সেই ঘোষণা বাস্তবায়নে কঠোর পদক্ষেপ দরকার।
ভোটারদের মনোভাব
বাংলাদেশে ভোটার জনসংখ্যা প্রায় ১২ কোটি। এর মধ্যে নতুন ভোটারের সংখ্যা বাড়ছে।
তরুণ ভোটারের বড় অংশ রাজনৈতিক বঞ্চনা, নেতৃত্বের সঙ্কট, দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের অভাব নিয়ে হতাশ।
এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বলেন,
“ভোট দেব, তবে নিরাপত্তা থাকলে। নিরপেক্ষ ভোট হলে আমরা বিশ্বাস ফিরে পাব।”
আস্থার সংকট কাটবে তো?
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তফসিল, প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও প্রচারণার তীব্রতা নির্বাচনের সময়সীমা এগিয়ে আসার বার্তা দিচ্ছে। কিন্তু সহিংসতা, প্রশাসনের আচরণ, গুজব, আন্তর্জাতিক চাপ, সংখ্যালঘু উদ্বেগ, অর্থনৈতিক সংকট—সব মিলিয়ে নির্বাচনী বাস্তবতা জটিল।
সুশীল সমাজ, গবেষক, সংবাদকর্মী এবং ভোটাররা বলছেন—
নির্বাচন হবে কিনা, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্বাচন কতটা নিরাপদ, প্রতিযোগিতামূলক ও গ্রহণযোগ্য হবে।
ভোটারদের শেষ প্রশ্ন—
“আমার ভোট কি গণনা হবে?”
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের গণতন্ত্র কোন পথে যাবে।










