আফসান আরা বিন্দুর শোবিজ যাত্রা শুরু হয় ২০০৬ সালে, যখন তিনি লাক্স–চ্যানেল আই সুপারস্টার প্রতিযোগিতায় প্রথম রানারআপ হন। সেই সময় এই রিয়েলিটি শো ছিল নতুন মুখ আবিষ্কারের সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম। বিন্দু সেখানে নিজেকে আলাদা করে চিনিয়েছিলেন তাঁর স্বাভাবিক সৌন্দর্য, আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি ও সাবলীল পারফরম্যান্সের মাধ্যমে।
প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নাটক ও বিজ্ঞাপনে নিয়মিত কাজ শুরু করেন তিনি। ছোট পর্দায় তাঁর অভিনয়ে ছিল এক ধরনের সহজাত স্বাচ্ছন্দ্য, যা দর্শকের চোখে দ্রুত ধরা পড়ে। সংলাপ বলার ভঙ্গি, ক্যামেরার সামনে স্বাভাবিক থাকা এবং চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তাঁকে সমসাময়িক অনেক অভিনয়শিল্পীর থেকে আলাদা করে তোলে। শুরুর দিকেই বোঝা গিয়েছিল, বিন্দু শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, অভিনয় দিয়েও নিজের জায়গা করে নিতে চান। সেই আত্মবিশ্বাসই পরবর্তীতে তাঁকে বড় পর্দার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
বড় পর্দা ও জনপ্রিয়তা
ছোট পর্দায় পরিচিত মুখ হওয়ার পর বিন্দু বড় পর্দায় পা রাখেন গুণী নির্মাতা তৌকীর আহমেদের ‘দারুচিনি দ্বীপ’ সিনেমার মাধ্যমে। এই ছবিতে তাঁর অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা পায় এবং একজন সম্ভাবনাময় অভিনেত্রী হিসেবে তাঁর নাম আলোচনায় আসে। এরপর একে একে ‘পিরিতের আগুন জ্বলে দ্বিগুণ’, ‘জাগো’ ও ‘এই তো প্রেম’–এর মতো বাণিজ্যিক ও গল্পনির্ভর ছবিতে কাজ করেন তিনি। বিশেষ করে ‘এই তো প্রেম’ সিনেমায় সুপারস্টার শাকিব খানের বিপরীতে অভিনয় করা বিন্দুর ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে ওঠে। বড় পর্দায় তাঁর উপস্থিতি, আবেগ প্রকাশ এবং চরিত্রের সঙ্গে মানানসই অভিনয় দর্শকের মধ্যে আলাদা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে। একই সময়ে টিভি নাটকেও তিনি ছিলেন সমান ব্যস্ত। নাটক ও সিনেমা—দুই মাধ্যমেই নিয়মিত কাজ করে বিন্দু নিজেকে একজন প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রী হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হন।
শুভ–বিন্দু জুটি ও গুঞ্জন
আরেফিন শুভর সঙ্গে বিন্দুর জুটি গড়ে ওঠে টেলিভিশন নাটকের মাধ্যমে। একাধিক নাটকে একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তাঁদের পর্দার রসায়ন দর্শকের নজর কাড়ে। সংলাপ বিনিময়, চোখের ভাষা এবং আবেগের প্রকাশে এই জুটির স্বাভাবিকতা ছিল চোখে পড়ার মতো। ফলে খুব দ্রুতই শুভ–বিন্দু জুটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। দর্শকের ভালোবাসার পাশাপাশি তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও নানা গুঞ্জন ছড়াতে শুরু করে। শোবিজ অঙ্গনে এমন আলোচনা নতুন কিছু নয়, তবে এই গুঞ্জন দুজনের কাজের জনপ্রিয়তাকেও বাড়িয়ে দেয়। যদিও তাঁরা প্রকাশ্যে কখনোই ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে সরাসরি কিছু বলেননি। দুজনই বরাবরই নিজেদের কাজকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তবু দর্শকের একাংশ তাঁদের জুটিকে বাস্তব জীবনেও একসঙ্গে দেখতে চেয়েছেন। এই আগ্রহই শুভ–বিন্দু জুটিকে সেই সময়ের আলোচিত অনস্ক্রিন জুটিগুলোর একটি করে তোলে।
দীর্ঘ বিরতি ও প্রত্যাবর্তন
২০১৪ সালের পর হঠাৎ করেই বিন্দুকে আর নিয়মিত অভিনয়ে দেখা যায়নি। ধীরে ধীরে তিনি মিডিয়ার আড়ালে চলে যান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁর উপস্থিতি ছিল খুবই সীমিত। দীর্ঘ এই বিরতিতে দর্শকের মনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়—কেন হঠাৎ এমনভাবে হারিয়ে গেলেন তিনি? প্রায় এক দশক পর ২০২৩ সালে চরকির ওয়েব ফিল্ম ‘উনিশ২০’–এর মাধ্যমে আবার আলোচনায় ফেরেন বিন্দু। এই ওয়েব ফিল্মে তাঁর বিপরীতে ছিলেন আরেফিন শুভ। পুরোনো জুটির পুনর্মিলন দর্শকের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে। মুক্তির পর ‘উনিশ২০’ দর্শকের প্রশংসা পায় এবং বিন্দুর অভিনয়ও ইতিবাচকভাবে আলোচিত হয়। অনেকেই ভেবেছিলেন, এবার হয়তো নিয়মিত অভিনয়ে ফিরবেন তিনি। তবে কাজটি সফল হলেও এরপর আবার তাঁকে তেমনভাবে দেখা যায়নি, যা দর্শকের কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দেয়।
পডকাস্টে খোলামেলা কথা
দীর্ঘ নীরবতার পর প্রথমবারের মতো একটি পডকাস্টে উপস্থিত হয়ে বিন্দু নিজের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি খোলামেলাভাবে ভাগ করেন। সঞ্চালকের প্রশ্নে আরেফিন শুভর সঙ্গে তাঁর পর্দার রসায়ন নিয়ে বিন্দু স্বীকার করেন, এই রসায়ন সত্যিই ছিল এবং তা এসেছে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও পেশাদার মনোভাব থেকে। প্রেমের গুঞ্জন ও তা ভেঙে যাওয়ার প্রসঙ্গে প্রশ্ন এলে কিছুটা সংকোচ প্রকাশ করলেও বিন্দু স্পষ্ট করে বলেন, তখন সবাই খুব অল্প বয়সী ছিলেন এবং কাজটাই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় বিষয়। তিনি বলেন, দুজন মানুষের পথচলা সব সময় এক জায়গায় গিয়ে শেষ হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। কাজের প্রতি সেই সময়ের অদম্য ভালোবাসাই তাঁদের সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল। তাঁর এই বক্তব্য অনেক পুরোনো প্রশ্নের উত্তর যেমন দিয়েছে, তেমনি নতুন করে আলোচনাও তৈরি করেছে।
ভবিষ্যৎ ভাবনা
ভবিষ্যতে আবার আরেফিন শুভর সঙ্গে কাজ করবেন কি না—এমন প্রশ্নে বিন্দু ইতিবাচক মনোভাবই প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, সুযোগ ও পরিবেশ অনুকূলে থাকলে শুভর সঙ্গে আবার কাজ করতে তাঁর কোনো আপত্তি নেই। বরং ভালো গল্প ও চরিত্র পেলে তিনি আগ্রহী। দীর্ঘ বিরতির পর পডকাস্টে তাঁর এই খোলামেলা উপস্থিতি দর্শকের মধ্যে নতুন আশা জাগিয়েছে। অনেকেই জানতে চাইছেন, তিনি কি আবার নিয়মিত অভিনয়ে ফিরবেন? যদিও এ বিষয়ে বিন্দু এখনো চূড়ান্ত কিছু বলেননি, তবে তাঁর কথাবার্তায় অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা স্পষ্ট। ফলে দর্শক ও ভক্তরা এখন অপেক্ষায়—আফসান আরা বিন্দু কি আবার নিয়মিতভাবে ছোট ও বড় পর্দায় ফিরবেন, নাকি এই উপস্থিতিই থাকবে ক্ষণিকের ঝলক।
বিথী রানী মণ্ডল/










