বিভিন্ন জালিয়াতির প্রভাবে সংকটে পড়া প্রিমিয়ার ব্যাংককে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ধার দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকের ডিমান্ড প্রমিসরি নোটের বিপরীতে ‘লেন্ডার অব দ্য লাস্ট রিসোর্ট’ হিসেবে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে এ অর্থ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কয়েকটি করপোরেট প্রতিষ্ঠান আকস্মিকভাবে আমানত তুলে নিলেও অন্য ব্যাংক থেকে টাকা পাচ্ছিল না প্রিমিয়ার ব্যাংক। ফলে বিশেষ এই ধার দেওয়া হয়। এর মধ্যে চার হাজার কোটি টাকার বন্ড ও এক হাজার কোটি টাকা নগদ দেওয়া হয়।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর প্রিমিয়ার ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ১৯৯৯ সালে ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত চেয়ারম্যান ছিলেন ডা. এইচবিএম ইকবাল। তাঁর স্ত্রী, ছেলেসহ পরিবারের একাধিক সদস্য ছিলেন পরিচালনা পর্ষদের সদস্য। বিভিন্ন জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকটির নারায়ণগঞ্জ শাখাসহ কয়েকটি শাখা থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের কারণে ব্যাংকটিতে বেশ আগে থেকে সংকট ছিল। এতদিন সামাল দেওয়ার মতো পরিস্থিতি থাকলেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আমানত তুলে নেওয়ার পর আবার তারল্য সংকটে পড়ে বিধিবদ্ধ তারল্য সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়।
বিদ্যমান নিয়মে, একটি ব্যাংকের মোট তলবি ও মেয়াদি দায়ের চার শতাংশ দ্বি-সাপ্তাহিক ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিধিবদ্ধ নগদ জমা বা সিআরআর রাখতে হয়। আর সহজে বিনিময়যোগ্য সম্পদ বা এসএলআর হিসেবে রাখতে হয় ১৩ শতাংশ। কোনো ব্যাংক এতে ব্যর্থ হলে জরিমানা গুনতে হয়। এতে বাজারে একটি নেতিবাচক বার্তা যায়।
বেসরকারি খাতের প্রিমিয়ার ব্যাংককে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ধার দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুদিন আগে ব্যাংকটিকে এই ধার দেয়। বড় কয়েকটি করপোরেট প্রতিষ্ঠান হঠাৎ বড় অঙ্কের আমানত তুলে নেওয়ায় ব্যাংকটিতে জরুরি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বলে জানা গেছে। আর সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ এই ধার দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, পাঁচ হাজার কোটি টাকার এই সহায়তার মধ্যে এক হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে নগদে। বাকি চার হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে বন্ডের মাধ্যমে। মূলত আন্তব্যাংক মুদ্রাবাজার থেকে টাকা সংগ্রহ করতে না পারায় প্রিমিয়ার ব্যাংককে এই বিশেষ সুবিধা দিতে হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সহায়তার ফলে ব্যাংকটির প্রতি গ্রাহক ও শেয়ারধারীদের আস্থা আরও বাড়বে বলে মনে করেন প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান। জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগের আমলের তুলনায় ব্যাংকটি এখন অনেক ভালো চলছে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কোনো অনিয়ম করছে না, অনিয়মের সুযোগও দিচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের ১৬(৪)(ডি) ধারা এবং ১৭(১)(বি) ধারা অনুযায়ী ৯০ দিন মেয়াদে সাড়ে ১১ শতাংশ সুদে এ অর্থ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকিং পরিভাষায় যা ওভারনাইট (ওডি) সুবিধা হিসেবে বিবেচিত। এর বিপরীতে সমমূল্যের ‘ডিমান্ড প্রমিসরি নোট’ তথা কোনো কারণে ব্যাংকটি বসে গেলে বা দেউলিয়া হলে সম্পদ বিক্রি করে যে অর্থ আসবে তা থেকে সর্বপ্রথম কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায় মেটানোর শর্তে এ অর্থ দেওয়া হয়েছে। এর আগে শরিয়াহভিত্তিক পরিচালিত ইসলামী ব্যাংক ও একীভূত হতে যাওয়া পাঁচ ব্যাংক একই উপায়ে অর্থ নিয়েছিল।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করে টাকা তুলে নেওয়ায় ব্যাংকটি তারল্য–সংকটে পড়েছিল। এই সংকট প্রকট হলে পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা ছিল। সেই ঝুঁকি এড়াতেই এই ধার দেওয়া হয়েছে। তবে ধারের বড় অংশই বন্ডের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে, নগদ দেওয়া হয়েছে মাত্র এক হাজার কোটি টাকা।
-মামুন










