গাজায় ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মাঝেই রমজানকে স্বাগত, ফের যুদ্ধ শুরুর শঙ্কা

ছবিঃ সংগৃহীত

ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির আবহে ও পুনরায় সংঘাত শুরুর আশঙ্কার মধ্যে পবিত্র রমজান মাসকে স্বাগত জানিয়েছে গাজার মানুষ। বাস্তুচ্যুতি, খাদ্যসংকট ও স্বজনহানির গভীর বেদনা সত্ত্বেও পরিবারগুলো চেষ্টা করছে সামান্য আনন্দ তৈরি করতে। কেন্দ্রীয় গাজার বুরেইজ শরণার্থী এলাকায় একটি অস্থায়ী তাঁবুতেই রমজান শুরু করেছেন ৫২ বছর বয়সী মাইসুন আল-বারবারাওয়ি। যুদ্ধের শুরুতে দক্ষিণ-পূর্ব গাজায় নিজের বাড়ি হারিয়ে স্বামী হাসসুনা ও দুই সন্তানকে নিয়ে বিভিন্ন শিবিরে ঘুরে অবশেষে এখানে আশ্রয় নেন তিনি। খবর আলজাজিরার।

তাঁবুর ছেঁড়া ছাদে ঝুলছে সাধারণ কিছু সাজসজ্জা ও একটি ছোট রমজানের ফানুস। নয় বছরের ছেলে হাসানের মুখে হাসি ফোটাতে কষ্টের মধ্যেও ফানুস কিনে দিয়েছেন মাইসুন। তিনি বলেন, “সামর্থ্য সীমিত, কিন্তু বাচ্চাদের মুখে হাসি দেখাই সবচেয়ে বড় বিষয়।” তবে এই রমজানেও পুরোপুরি স্বস্তি নেই। গত ১০ অক্টোবর ২০২৫ থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও তা এখনও নড়বড়ে। মাঝেমধ্যে গোলাবর্ষণের শব্দ শোনা যায়। মাইসুন বলেন, “গত দুই বছরের ভয়াবহ সময়ের তুলনায় পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত, কিন্তু আমরা জানি যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হয়নি।”

গত বছরের রমজানে, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে আবারও সংঘাত শুরু হয়েছিল। সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খাদ্য সহায়তা বন্ধ হয়ে পড়ে এবং ভয়াবহ খাদ্যসংকট দেখা দেয়। সেই স্মৃতি এখনও তাজা। “মানুষ বলছে খাবার মজুত করতে, যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে,” উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলেন মাইসুন। “গত রমজানে যুদ্ধ আর দুর্ভিক্ষ একসঙ্গে ছিল। আমার ছোট ছেলে ক্ষুধায় মৃত্যুর জন্য দোয়া করত।” জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কিছু খাদ্যপণ্যের সরবরাহ আগের তুলনায় কিছুটা উন্নত হলেও বাজারে দাম এখনও অনেক বেশি। অধিকাংশ পরিবার মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।

ডেইর আল-বালাহ এলাকায় আশ্রয় নেওয়া ৫৫ বছর বয়সী হানান আল-আত্তারও তেমনই একজন। উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া থেকে পালিয়ে আসা হানান রমজানের প্রথম দিন একটি সহায়তা প্যাকেট পেয়েছেন। প্যাকেট খুলে তিনি জানান, এতে ছিল ফাভা বিন, খেজুর, তেল, ডাল, তাহিনি ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী। “আজ অন্তত ইফতার নিয়ে দুশ্চিন্তা কমল,” বলেন তিনি। তবে তাঁর রমজান আনন্দহীন। গত বছর এক বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন তাঁর দুই ছেলে-আব্দুল্লাহ ও মোহাম্মদ। চোখ ভিজে আসে স্মৃতিচারণে। “পরিবার একত্র হয়, কিন্তু যারা নেই, তাদের শূন্যতা খুব কষ্ট দেয়,” বলেন তিনি।

শিবিরে বিদ্যুৎ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় খাবার প্রতিদিনই কিনতে হয়। দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটে কাঠ জ্বালিয়ে রান্না করতে হয়। “গ্যাস এখন আমাদের কাছে ধনসম্পদ,” বলেন হানান। দুই মাস আগে ভরা একটি গ্যাস সিলিন্ডার তিনি রমজানের জন্য জমিয়ে রেখেছেন। অসংখ্য কষ্টের মধ্যেও গাজার মানুষের একটাই প্রার্থনা-শান্তি ও নিরাপত্তা। মাইসুনের ভাষায়, “এই রমজান যেন সবার জন্য কল্যাণ ও শান্তি বয়ে আনে। আমরা যেন আবার আমাদের ঘরে ফিরতে পারি।”

-বেলাল