দেশ জর্জরিত সরকার পরিবর্তন ও শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নের ঘাটতিতে

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে শাসকগোষ্ঠীর পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের সম্পর্ক। স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিটি সরকারই শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং কাঠামোগত উন্নয়নের জন্য নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। যার মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষা কমিশন গঠন একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। তবে প্রায়শই এই কমিশনগুলোর সুপারিশগুলো সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়নি, মূলত রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা, এবং বাজেট সংকটের কারণে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিটিবির এক কর্মকর্তা বলেন, যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম নিঃসন্দেহে ভালো। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা দরকার, তাতে এখনো ঘাটতি রয়েছে। তাই নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষকের ব্যবস্থা যেমন করতে হবে, তেমনি তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত উপকরণের ব্যবস্থাও নিতে হবে। নইলে সমস্যাটি থেকে যাবে।
জানা গেছে, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সরকার পরিবর্তনের সাথে শিক্ষা কমিশন গঠনের সম্পর্ক সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতা ও নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত। যখনই নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে, তারা শিক্ষাব্যবস্থাকে তাদের রাজনৈতিক দর্শন, আদর্শ এবং নীতির প্রতিফলন ঘটানোর একটি প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। এই প্রক্রিয়ায়, শিক্ষাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ শিক্ষা একটি দেশের জনগণের মানসিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ, এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুতরাং, শিক্ষাব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক শক্তি তাদের আদর্শকে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে।
তথ্যমতে, সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নবগঠিত সরকারের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে দাঁড়াচ্ছে শিক্ষা খাত। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অপর্যাপ্ত অর্থায়ন, নীতিগত অসংগতি এবং বাস্তবায়নের ঘাটতিতে জর্জরিত শিক্ষাব্যবস্থা আজ কাঠামোগত সংস্কারের এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে। শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষা উদ্যোক্তা- সব পক্ষই প্রায় এক বাক্যে বলেছেন, এবার আর কসমেটিক পরিবর্তন নয়; প্রয়োজন গভীর, সাহসী ও টেকসই সংস্কার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা খাতে সংকটের মূল সূত্রপাত হয় বাজেট বরাদ্দ থেকে। জাতীয় বাজেটে জিডিপির তুলনায় শিক্ষায় বরাদ্দ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের চেয়েই কম, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে অবকাঠামো, শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং সামগ্রিক শিক্ষার মানে। এ প্রসঙ্গে শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আলোকিত স্বদেশকে বলেন- শিক্ষাকে যদি উন্নয়নের খরচ হিসেবে দেখা হয়, ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে দেখা না হয়, তাহলে কোনো সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হবে না।’
তিনি আরও বলেন, বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোডিং ও সৃজনশীল দক্ষতার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের পাঠ্যক্রম এখনও প্রায় এক দশক আগের চিন্তাধারায় আবদ্ধ। তার মতে, সরকার যদি স্টার্টআপ, এডটেক ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় নীতিগত সহায়তা দেয়, তবে শিক্ষিত বেকারত্ব ও কর্মসংস্থান সংকট অনেকটাই লাঘব করা সম্ভব।
এদিকে, শিক্ষকদের বড় অংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। বহু প্রতিষ্ঠানে যোগ্য শিক্ষকের সংকট থাকলেও নতুন নিয়োগ প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে আছে। মতিঝিলের একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেন, ‘আমরা শুধু বেতন বৃদ্ধির কথা বলছি না। আমরা চাই নিয়মিত প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ ও পেশাগত মর্যাদা। দক্ষ শিক্ষক ছাড়া আধুনিক পাঠ্যক্রমও শেষ পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে পড়ে।’
তথ্যমতে, বর্তমান শিক্ষা পাঠ্যক্রমের পুরনো কাঠামো নিয়েও শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের ভাষায়- বর্তমান শিক্ষা এখনও মুখস্থনির্ভর ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক। কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী তানজিয়া আক্তার বলেন, ‘আমরা নম্বর পাচ্ছি, কিন্তু দক্ষতা অর্জন করছি না। বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করেও চাকরির বাজারে গিয়ে নিজেকে অপ্রস্তুত মনে হয়। বাধ্য হয়েই আবার কোচিংনির্ভর প্রস্তুতিতে যেতে হয়।’
অভিভাবকরাও চান এমন শিক্ষা, যা সন্তানকে বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করবে, শুধু সনদধারী করে তুলবে না। এ বিষয়ে অভিভাবকদের সংগঠন অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. জিয়াউল কবির দুলু বলেন, ‘শিক্ষা মানে শুধু ভালো ফল নয়; শিক্ষা মানে জীবনবোধ, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের বিকাশ। আমরা চাই, বিদ্যালয় থেকেই শিশুদের সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ দক্ষতা, দলগত কাজ ও প্রযুক্তির মৌলিক জ্ঞান শেখানো হোক।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিক্ষা প্রশাসনের ভেতরের চিত্রও কম উদ্বেগজনক নয়। বহু প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক শূন্যতা, কোথাও আবার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘নীতিমালা আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। সংস্কার শুরু করতে হলে প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই হবে।’
নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা তাই স্পষ্ট। এ বিষয়ে শিক্ষাবিদ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ ফোনে বলেন- ‘প্রথমত, শিক্ষা বাজেট উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, পাঠ্যক্রমকে দক্ষতাভিত্তিক ও যুগোপযোগী করতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।’
শিক্ষাক্রম বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা শুধু একটি খাত নয়- এটি গণতন্ত্র, অর্থনীতি ও সামাজিক অগ্রগতির ভিত্তি। নতুন সরকার শুরুতেই শিক্ষাকে অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে রাখলে এই আস্থার সংকট কাটিয়ে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
স্বাধীন শিক্ষা কমিশন গঠন: শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ শিক্ষা কমিশন গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কমিশন সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে শিক্ষার মানোন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে। এতে শিক্ষাবিদ, গবেষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি পরামর্শক দল তৈরি করা উচিত। যা সমাজের প্রতিটি অংশের মতামত প্রতিফলিত করবে।
ধারাবাহিক শিক্ষানীতি: নতুন সরকারের উচিত পূর্ববর্তী শিক্ষানীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং শিক্ষার মানোন্নয়ন ও কাঠামোগত উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা। এজন্য শিক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সুপারিশের ধারাবাহিক বাস্তবায়ন অত্যাবশ্যক। এক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো গঠন করা উচিত। যা এই নীতির বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক করবে, ফলে সরকার পরিবর্তন হলেও শিক্ষানীতির ধারাবাহিকতা ব্যাহত হবে না। এছাড়া, শিক্ষাখাতের উন্নয়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি অন্যান্য মন্ত্রণালয় (যেমন তথ্যপ্রযুক্তি, অর্থনীতি, শ্রম মন্ত্রণালয়) সমন্বয়ে একটি সমন্বিত শিক্ষানীতি গঠন করা গুরুত্বপূর্ণ।
বাজেট ও অর্থায়ন বৃদ্ধি: শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ অত্যাবশ্যক। অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করে একটি নিরবচ্ছিন্ন বাজেট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষা—প্রতিটি স্তরের জন্য সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ থাকবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিক্ষায় বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে মাধ্যমে অর্থায়ন বাড়াতে হবে। এতে শিক্ষার অবকাঠামো ও মানোন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখা সম্ভব।
প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি রোধ: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতি কমাতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষকের নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, এবং প্রশাসনিক কাজগুলোতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দুর্নীতি রোধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যাতে এই খাতে কোনো ধরনের অনিয়মের সুযোগ না থাকে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড বা শিক্ষকদের কার্যক্রমে কোনো অনিয়ম বা অন্যায় হলে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, এবং স্থানীয় কমিউনিটিকে সরাসরি অভিযোগ করার সুযোগ দিতে একটি নিরপেক্ষ ও কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থা চালু করা উচিত, যা সবার জন্য সহজলভ্য এবং স্বচ্ছ হবে।
শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার: শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। যাতে শিক্ষার্থীরা যুগোপযোগী শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। শিক্ষকদের ডিজিটাল দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করতে হবে। যাতে তারা প্রযুক্তি-ভিত্তিক পাঠদান কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে পারেন।
এ বিষয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম উন্নয়ন ও পরিমার্জন কোর কমিটির সদস্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক এম তারিক আহসান ফোনে এ প্রতিবেদককে জানান, শিক্ষা হলো একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও উন্নত জাতি গঠনের মূল চাবিকাঠি। শিক্ষার সঙ্গে শিক্ষাক্রম শব্দটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সাধারণত শিক্ষাক্রম বলতে বোঝায় নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা। লাগামহীন ঘোড়া যেমন নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না, ঠিক তেমনই সঠিক শিক্ষাক্রম ছাড়া কাঙ্ক্ষিত নাগরিক গড়ে তোলা যায় না। বলাবাহুল্য, মানসম্পন্ন এবং আধুনিক শিক্ষাক্রম ছাড়া উন্নত দেশ ও জাতি গঠনের আশা অরণ্যে রোদন ছাড়া আর কিছু নয়।
-এস এম শামসুজ্জোহা