মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখন একদিকে যুদ্ধের কালো মেঘ, অন্যদিকে কূটনীতির ধীর লয়। একদিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অনড় অবস্থান, অন্যদিকে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে এক নতুন ‘লাভজনক’ চুক্তির হাতছানি। আগামী মঙ্গলবার জেনেভায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া দ্বিতীয় দফার পারমাণবিক আলোচনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতিতে এখন চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তিনি কেবল সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা নয়, বরং ইরানের পরমাণু অবকাঠামো সম্পূর্ণ উপড়ে ফেলার পক্ষপাতী। তার দাবি—সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ এবং কঠোর আন্তর্জাতিক পরিদর্শন। হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সপ্তম বৈঠকের পর নেতানিয়াহুর এই কঠোর অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইসরায়েল কোনো ‘অর্ধেক চুক্তিতে’ সন্তুষ্ট নয়। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী, যা নেতানিয়াহুর কৌশলের সঙ্গে কিছুটা সাংঘর্ষিক হতে পারে।
ইরান এবার এক অভিনব চাল চেলেছে। দেশটির কূটনীতিক হামিদ ঘানবারির মতে, তারা এমন একটি চুক্তি চায় যা কেবল তেহরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সরাবে না, বরং আমেরিকার জন্যও ‘লাভজনক’ হবে। তেল-গ্যাস ক্ষেত্র, খনি এবং আকাশযান কেনার মতো উচ্চ মুনাফার খাতে মার্কিন বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়ে তেহরান আসলে ট্রাম্পের ‘বিজনেস মাইন্ডসেট’কে টার্গেট করছে। এটি ২০১৫ সালের চুক্তির চেয়ে আলাদা, যেখানে কেবল রাজনৈতিক সমঝোতা ছিল, সরাসরি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব ছিল না।
কূটনৈতিক আলোচনার সমান্তরালে সামরিক উত্তেজনাও তুঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ওই অঞ্চলে দ্বিতীয় একটি বিমানবাহী রণতরী পাঠিয়েছে। ওয়াশিংটনের প্রচ্ছন্ন হুমকি—আলোচনা ব্যর্থ হলে দীর্ঘমেয়াদী সামরিক অভিযান। পাল্টা জবাবে ইরানও জানিয়েছে, তাদের ওপর হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি মার্কিন ঘাঁটি হবে লক্ষ্যবস্তু। এই ‘প্রেশার ট্যাকটিকস’ বা চাপের কৌশল দুই পক্ষই ব্যবহার করছে আলোচনার টেবিলে নিজেদের পাল্লা ভারী করতে।
জেনেভা আলোচনার ঠিক আগ মুহূর্তে লেবানন ও সিরিয়া সীমান্তে ইসরায়েলি বিমান হামলা পরিস্থিতির জটিলতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলের এই নিয়মিত হামলা এবং সিরিয়ায় মার্কিন ঘাঁটিগুলোর নিয়ন্ত্রণ সিরীয় সেনাবাহিনীর হাতে চলে যাওয়া—এই অঞ্চলের মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন সরাসরি সিরীয় সরকারের সঙ্গে অংশীদারিত্বের দিকে ঝুঁকছে, যা কুর্দি বিদ্রোহীদের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
এরই মধ্যে ইউক্রেনের সাবেক জ্বালানিমন্ত্রী গেরমান গালুশচেঙ্কোর গ্রেপ্তার বিশ্বজুড়ে জ্বালানি রাজনীতির অন্ধকার দিকটি উন্মোচন করেছে। ১০০ মিলিয়ন ডলারের এই কেলেঙ্কারি প্রমাণ করে যে, যুদ্ধের আবহেও পর্দার আড়ালে বিশাল অর্থপাচার ও ঘুষের কারবার সচল থাকে। এটি পরোক্ষভাবে পশ্চিমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে যেন তারা তাদের মিত্র দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে।
জেনেভায় ওমানের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিতব্য এই বৈঠকে ট্রাম্পের দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগী জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফের উপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ট্রাম্প প্রশাসন কি নেতানিয়াহুর দাবি মেনে ইরানকে কোণঠাসা করবে, নাকি তেহরানের দেওয়া ‘অর্থনৈতিক টোপ’ গিলে এক নতুন বাণিজ্যিক চুক্তিতে আবদ্ধ হবে? এই উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি অথবা এক ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধ।
-এম. এইচ. মামুন










