১৭ বছরের দীর্ঘ স্বেচ্ছানির্বাসনের পর লন্ডনের কুয়াশা পেরিয়ে ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে দেশে ফিরেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার প্রত্যাবর্তন শুধু ব্যক্তিগত ফিরে আসা নয়; এটি দেশের রাজনীতিতে নাটকীয় পুনঃপ্রবেশ, বহু জল্পনা-কল্পনার অবসান এবং নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের সূচনা।
কিন্তু উচ্ছ্বাস বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। মাত্র পাঁচ দিন পর, ৩০ ডিসেম্বর, ইন্তেকাল করেন তার মা, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। ব্যক্তিগত শোকের পাশাপাশি এটি বিএনপির এক যুগের রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি নির্দেশ করে।
শোককে পেছনে রেখে তারেক রহমান দল পুনর্গঠন শুরু করেন। তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পর্যন্ত পুনর্বিন্যাস, নির্বাচনি প্রস্তুতি এবং সমর্থকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় লাভ করে।
এবার তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী পদে নতুন দায়িত্ব নেবেন। সরকারের সামনে আছে জনআকাঙ্ক্ষা, রাজনৈতিক প্রত্যাশা এবং জটিল অর্থনৈতিক বাস্তবতা। ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, সামাজিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে দ্রুত ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন।
অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ
অর্থনৈতিক অবস্থা: ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিপ্লবের পর বাংলাদেশে অর্থনীতি সংকটাপন্ন। বিনিয়োগ স্থবির, কর্মসংস্থান কমে গেছে এবং রপ্তানি আয় নেতিবাচক প্রবণতায় রয়েছে। সিপিডির ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বিনিয়োগ স্থবিরতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টির দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণপ্রবাহের ধীরগতি এবং বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা।”
নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা: ব্যবসায়িক ও বিনিয়োগ পরিবেশ পুনর্জীবিত করতে আইনশৃঙ্খলার দৃঢ় ব্যবস্থা জরুরি। মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “শিল্প ও ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু রাখতে আইনশৃঙ্খলার দৃশ্যমান উন্নতি অপরিহার্য।”
বিনিয়োগ ও অর্থনীতি: ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৬.১০ শতাংশে নেমেছে, নিট বিদেশি বিনিয়োগ ১.৪১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃস্থাপন নতুন সরকারের প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ।”
মূল্যস্ফীতি: ডিসেম্বর ২০২৫-এ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ১০.৮৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য এটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মোকাবিলা করতে হবে।
রপ্তানি ও রাজস্ব: ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে রপ্তানি আয় ৪.৪১ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি পর্যন্ত রপ্তানি আয় ২৮.৪১২ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। নতুন সরকারকে কার্যকর পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।
রাজস্ব আদায়ও লক্ষ্য পূরণে কম। জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের লক্ষ্য ছিল ২ লাখ ৩১ হাজার ২০৫ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ২২৯ কোটি। ফলে রাজস্ব বৃদ্ধি, করজাল সম্প্রসারণ এবং বাজেট পরিচালনায় সতর্ক পদক্ষেপ জরুরি।
অর্থনৈতিক খাত ও ব্যাংকিং: নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাংক খাতে অপরিশোধিত ঋণ (NPL) ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে। সিপিডির অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “প্রথমে আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।”
দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থান: ২০২৫ সালে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২৭.৯৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। চরম দারিদ্র্য ৯.৩৫ শতাংশে উন্নীত। নতুন সরকারের উচিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা।
বাজেট ও পরিকল্পনা
নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের পর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা হবে। অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করান, “শপথ গ্রহণের পর জনগণের প্রত্যাশা প্রতিফলিত করে বাজেট প্রণয়নের দায়িত্ব রয়েছে। তহবিল ব্যবস্থাপনা এবং অর্থ সংগ্রহই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।”
এলডিসি উত্তরণ: বাংলাদেশ ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে। শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানো প্রতিযোগিতায় প্রভাব ফেলতে পারে। তৈরি পোশাক খাতকে বৈচিত্র্যময় ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও ফ্রি ট্রেড চুক্তি (পি.টি.এ/এফ.টি.এ) শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ
পররাষ্ট্রনীতি কিছু ক্ষেত্রে দুর্বল এবং পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, “নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ভারতের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে গতিশীল করতে হবে। ভারসাম্যপূর্ণ, মর্যাদাপূর্ণ ও বাস্তবমুখী কূটনীতি বড় সংকট এড়াতে সহায়ক।”
-এমইউএম










