সুদানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহিউদ্দিন সালেম বলেছেন, দেশটির চলমান গৃহযুদ্ধে বিদেশি হস্তক্ষেপ মোকাবিলা করে সুদান পুরো আফ্রিকা মহাদেশকে রক্ষা করছে। তিনি আফ্রিকান ইউনিয়নের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, সুদানের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকারকে সমর্থন দেওয়ার জন্য। খবর আলজাজিরার।
ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় আফ্রিকান ইউনিয়নের শান্তি ও নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের ফাঁকে আল জাজিরা -কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সালেম বলেন, সরকারপন্থী সুদানি সশস্ত্র বাহিনী (এসএএফ) ও আধাসামরিক র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর মধ্যে যুদ্ধ আসলে “বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে লড়াই”। তার ভাষায়, “সুদানে যে যুদ্ধ চলছে, তা বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। বিপুল সংখ্যক ভাড়াটে যোদ্ধা, বিদেশি অর্থায়ন ও উন্নত অস্ত্রের মাধ্যমে এই সংঘাত উসকে দেওয়া হচ্ছে। সুদান এই ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে আফ্রিকার পেছন দিক সুরক্ষিত করছে।”
আফ্রিকান ইউনিয়নে সদস্যপদ পুনর্বহালের আহ্বান
সালেম বলেন, আফ্রিকান ইউনিয়নের শান্তি ও নিরাপত্তা পরিষদ সুদানের পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং টেকসই স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় তাদের সরকারকে সহযোগিতা করা উচিত। চার বছরের বেশি সময় ধরে স্থগিত থাকা সুদানের সদস্যপদ পুনর্বহাল করা হলে তা পুরো আফ্রিকার জন্যই উপকারী হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। ২০২১ সালের অক্টোবরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আবদাল্লা হামদোকের সরকারকে সরিয়ে জরুরি অবস্থা জারির পর আফ্রিকান ইউনিয়ন সুদানের সদস্যপদ স্থগিত করে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে অভি্যোগ
সুদান দীর্ঘদিন ধরে ইউনাইটেড আরব আমিরাত-এর বিরুদ্ধে আরএসএফকে অস্ত্র ও অর্থ সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ করে আসছে। গত বছর সুদান ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস-এ একটি মামলা দায়ের করে, যেখানে পশ্চিম দারফুরে মাসালিত সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যায় আমিরাতকে “সহযোগী” হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। তবে আমিরাত এসব অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে। সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্স -এর এক প্রতিবেদনে ইথিওপিয়ায় আরএসএফের জন্য একটি প্রশিক্ষণ শিবিরে আমিরাতের অর্থায়নের অভিযোগ ওঠে। এ অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করে আমিরাত জানিয়েছে, তারা সুদানের সংঘাতে কোনো পক্ষ নয়; বরং মানবিক সহায়তা ও যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টায় মনোযোগী।
সৌদি আরবের উদ্বেগ
এদিকে সুদানের সরকারের ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরব গত শনিবার এক বিবৃতিতে সংঘাতে “বিদেশি হস্তক্ষেপ” এবং অবৈধ অস্ত্র, ভাড়াটে যোদ্ধা ও বিদেশি লড়াকুদের প্রবাহের নিন্দা জানিয়েছে। যদিও বিবৃতিতে কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
মানবিক সংকট গভীরতর
প্রায় তিন বছর ধরে চলা এই সংঘাতে আনুমানিক ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ২ কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষ-যা মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক-তীব্র খাদ্যসংকটে পড়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য বলছে। জাতিসংঘ-সমর্থিত বিশেষজ্ঞরা সম্প্রতি সতর্ক করেছেন, পশ্চিম সুদানের দারফুর অঞ্চলের আরও দুটি এলাকায় তীব্র অপুষ্টি দুর্ভিক্ষের মাত্রায় পৌঁছেছে।
আফ্রিকান ইউনিয়নের শান্তি ও নিরাপত্তা পরিষদ সুদানে বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, অবকাঠামো ধ্বংস ও মানবিক সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে তারা অবিলম্বে মানবিক যুদ্ধবিরতি, নিরবচ্ছিন্ন ত্রাণ সহায়তা এবং বেসামরিক নাগরিক ও ত্রাণকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। তবে বৈঠকে সুদানের সদস্যপদ পুনর্বহাল করা হয়নি। পরিষদের বিবৃতিতে সুদানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেকোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলা হয়েছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড সংঘাতকে আরও উসকে দিচ্ছে। সুদানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, সংঘাত শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং সরকার শান্তির পথেই এগোতে চায়। তবে আন্তর্জাতিক মহলের একাংশের মতে, ময়দানের পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত নাজুক এবং টেকসই সমাধানের জন্য কার্যকর যুদ্ধবিরতি অপরিহার্য।
-বেলাল










