রাশিয়ার ব্যাপক বিমান হামলা, ইউক্রেনে বাড়ছে হতাহত

রাশিয়া আবারও ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সামনের সারির যুদ্ধকৌশলে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ইউরোপীয় কমিশন রাশিয়ার সমুদ্রপথে রপ্তানিকৃত তেলের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব দেওয়ায় সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। খবর আলজাজিরার।

গত ৭ ফেব্রুয়ারি, ফ্রান্সের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কিয়েভ সফরকালে রাশিয়া বড় আকারের হামলা চালায়। এর কয়েক দিন আগে, ৩ ফেব্রুয়ারি, উত্তর আটলান্টিক সামরিক জোটের মহাসচিবের সফরের দিনও একই ধরনের শক্তিশালী হামলা হয়।

ইউক্রেনের সামরিক সূত্র জানায়, সর্বশেষ হামলায় ৪০৮টি ড্রোন ও ৩৯টি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়। ইউক্রেন অধিকাংশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম হলেও কয়েকটি জ্বালানি অবকাঠামোয় আঘাত হানে। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি কেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে এবং অন্যগুলো উৎপাদন কমিয়েছে। গত জানুয়ারি থেকে রাশিয়া ধারাবাহিকভাবে ইউক্রেনের জ্বালানি ব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করছে। তীব্র শীতে, শূন্যের নিচে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বহু মানুষ বিদ্যুৎ ও তাপের ঘাটতিতে ভুগছেন। পূর্বাঞ্চলীয় শহর বোহোদুখিভে এক ড্রোন হামলায় দুই শিশু ও তাদের পিতা নিহত হন; গর্ভবতী মা প্রাণে বেঁচে যান। দোনেৎস্ক অঞ্চলেও পৃথক হামলায় মা ও মেয়ে নিহত হয়েছেন। ওডেসায় সাম্প্রতিক হামলায় প্রায় তিন লাখ মানুষ বিদ্যুৎ ও পানিবিহীন হয়ে পড়েন।

ইউক্রেনের পাল্টা পদক্ষেপ

ইউক্রেন রাশিয়ার অভ্যন্তরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। ৫ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী জানায়, আস্ত্রাখান অঞ্চলের একটি পরীক্ষাকেন্দ্রে দেশীয় তৈরি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। পরবর্তীতে একটি সমাবেশ ভবন ও গুদাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা নিশ্চিত করা হয়। আরেকটি গবেষণা কারখানাতেও হামলার দাবি করেছে কিয়েভ, যেখানে জ্বালানি সংযোজক ও বিস্ফোরকসহ দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্য উৎপাদন হয় বলে অভিযোগ।

ইউক্রেনের সেনাপ্রধান ওলেক্সান্দর সিরস্কি জানান, জানুয়ারিতে রাশিয়ার নিহত ও গুরুতর আহতের সংখ্যা ৩১ হাজার ৭০০-যা ওই মাসে নতুন নিয়োগের চেয়ে প্রায় ৯ হাজার বেশি। তার ভাষায়, রুশ বাহিনীকে চাপে রাখা এবং অগ্রগতি ঠেকানোই তাদের লক্ষ্য।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান রুশ বাহিনীর ব্যবহৃত স্যাটেলাইট যোগাযোগ টার্মিনাল বিচ্ছিন্ন করায় রুশ যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা লেগেছে বলে ইউক্রেনীয় সূত্র দাবি করেছে।

শান্তি আলোচনা অনিশ্চিত

এ বছর আবুধাবিতে রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দুই দফা বৈঠক হলেও যুদ্ধবিরতি হয়নি; কেবল বন্দি বিনিময় হয়েছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে ক্রেমলিনের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। জেলেনস্কি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, জুনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া ইউক্রেন বা ইউরোপকে পাশ কাটিয়ে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে।

রুশ তেলের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব

৬ ফেব্রুয়ারি ইউরোপীয় কমিশন রাশিয়ার সমুদ্রপথে তেল রপ্তানির ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব দেয়। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও শিল্পোন্নত সাত দেশের জোট রুশ তেলের দাম বাজারমূল্যের নিচে নির্ধারণে বাধ্য করলেও নতুন প্রস্তাবে পুরো বাণিজ্য বন্ধের কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবে রুশ ছায়া নৌবহরের আরও ৪৩টি তেলবাহী জাহাজকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক ব্যাংক, ভার্চুয়াল মুদ্রা লেনদেন, ধাতু ও রাসায়নিক আমদানি এবং তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে প্রযুক্তি রপ্তানির ফাঁকফোকর বন্ধের ব্যবস্থাও রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে হতাহতের চাপ, অন্যদিকে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ও তেল রপ্তানিতে সম্ভাব্য পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা-সব মিলিয়ে রাশিয়া বাড়তি কৌশলগত চাপে পড়তে পারে।

-বেলাল