প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দ্বারপ্রান্তে তারেক রহমান: রয়টার্স

ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফিরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এখন বাংলাদেশের শাসনভার গ্রহণের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ফেরার দুই মাস না পেরোতেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জনমত জরিপের পূর্বাভাস সঠিক হলে বৃহস্পতিবারের নির্বাচন ৬০ বছর বয়সী শান্ত স্বভাবের এই নেতার জন্য হবে এক নাটকীয় প্রত্যাবর্তন। তার বাবা জিয়াউর রহমান ও মা বেগম খালেদা জিয়া একসময় দেশ পরিচালনা করেছেন; এবার সেই ধারাবাহিকতায় তিনিও দেশের নেতৃত্ব দিতে পারেন।

গত বছরের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে তারেক রহমানকে বীরোচিত সংবর্ধনা দেওয়া হয়। বর্তমানে শেখ হাসিনা ভারতের নয়াদিল্লিতে নির্বাসনে রয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। তারেক রহমানের বাবা জিয়াউর রহমান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন।

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, তিনি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব নতুনভাবে সাজাতে চান, যাতে বিনিয়োগ বাড়ে, তবে কোনো একক শক্তির ওপর দেশ অতিরিক্তভাবে নির্ভরশীল না হয়। এটি শেখ হাসিনার নীতির বিপরীত, যিনি ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের জন্য পরিচিত ছিলেন।

তারেক রহমান দরিদ্র পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে খেলনা ও চামড়াজাত পণ্যের মতো খাতে জোর দেওয়ার কথা বলেছেন। তিনি স্বৈরাচারী প্রবণতা রোধে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই দফা বা ১০ বছরে সীমাবদ্ধ রাখার প্রস্তাবও দিয়েছেন।

কার্ডিওলজিস্ট স্ত্রী ও ব্যারিস্টার কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে ঢাকায় ফেরার পর সময় কিভাবে কেটেছে, তা বুঝে ওঠার সুযোগও পাননি বলে জানান তারেক রহমান। বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে কন্যাকে পাশে নিয়ে রয়টার্সকে তিনি বলেন, “আমরা দেশে আসার পর প্রতিটি মিনিট কিভাবে কেটেছে, আমি নিজেও জানি না।”

১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকায় জন্ম তারেক রহমানের। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও তা শেষ করেননি। পরে তিনি বস্ত্র ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন।

দেশে ফেরার পর তারেক রহমান নিজেকে একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। শেখ হাসিনার শাসনামলে নিজের ও পরিবারের ওপর হওয়া নিপীড়নের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিশোধ নয়, বরং শান্তি ও স্থিতিশীলতাই দেশের জন্য প্রয়োজন।

রয়টার্সকে তিনি বলেন, “প্রতিশোধে কী আসে? প্রতিশোধের কারণে মানুষকে দেশ ছাড়তে হয়। এতে কোনো ভালো কিছু হয় না। এই মুহূর্তে আমাদের দেশের জন্য প্রয়োজন শান্তি ও স্থিতিশীলতা।”

শেখ হাসিনার শাসনামলে তারেক রহমান একাধিক মামলার আসামি ছিলেন এবং অনুপস্থিতিতেই কয়েকটি মামলায় দণ্ডিত হন। তিনি এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছিলেন। হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সব মামলায় তিনি খালাস পান।

নির্বাসিত অবস্থায় লন্ডনে বসে তিনি দেখেছেন, কীভাবে একের পর এক নির্বাচনে বিএনপি কোণঠাসা হয়েছে, শীর্ষ নেতারা কারাবন্দি হয়েছেন, কর্মীরা নিখোঁজ হয়েছেন এবং দলীয় কার্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে।

দেশে ফিরে তারেক রহমান সংযত ও পরিমিত ভাষায় বক্তব্য দিচ্ছেন, উসকানিমূলক বক্তব্য এড়িয়ে যাচ্ছেন এবং সমঝোতা ও সংযমের আহ্বান জানাচ্ছেন। তিনি ‘রাষ্ট্রের ওপর জনগণের মালিকানা’ ফিরিয়ে আনা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কথা বলছেন যা নতুন সূচনার আশায় থাকা বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে উদ্দীপনা তৈরি করেছে।

দলের ভেতরে তারেক রহমানের নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় বলে জানিয়েছে দলীয় সূত্র। প্রার্থী নির্বাচন, নির্বাচনী কৌশল ও জোট আলোচনা সবকিছুই তিনি সরাসরি তদারকি করছেন, যা আগে তিনি বিদেশ থেকে করতেন।

তারেক রহমানের ভাষায়, “গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও তা টিকিয়ে রাখাই হবে আমার সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। গণতন্ত্র চর্চার মাধ্যমেই আমরা সমৃদ্ধ হতে পারি এবং দেশ পুনর্গঠন করতে পারি। গণতন্ত্র থাকলে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা যায়। তাই আমরা গণতন্ত্র চর্চা করতে চাই এবং দেশকে নতুন করে গড়ে তুলতে চাই।”

-এমইউএম