মিউনিখে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সম্মেলনের প্রাক্কালে ইউরোপজুড়ে ছায়া ফেলেছে ট্রাম্পের বিশ্বব্যবস্থা

ছবিঃ সংগৃহীত

এক বছর আগে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের দেওয়া বক্তব্য ইউরোপীয় নেতাদের হতবাক করে দিয়েছিল। অভিবাসন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে ইউরোপকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করে তিনি বলেছিলেন, ইউরোপের সবচেয়ে বড় হুমকি বাইরের নয়, ভেতর থেকেই আসছে। এরপর থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন হোয়াইট হাউস কার্যত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থাকে উল্টে দিয়েছে। মিত্র ও প্রতিপক্ষ-সবাইকে শাস্তিমূলক শুল্কের মুখে পড়তে হয়েছে। ভেনেজুয়েলায় নজিরবিহীন সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে। খবর বিবিসির।

ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ওয়াশিংটনের শান্তি প্রচেষ্টা ছিল মস্কোর পক্ষে ঝুঁকে থাকা। এমনকি কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের “৫১তম অঙ্গরাজ্য” করার দাবিও তোলা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, চলতি সপ্তাহে শুরু হতে যাওয়া মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন আবারও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিও। ৫০টিরও বেশি দেশের শীর্ষ নেতা এতে অংশ নিচ্ছেন। এমন এক সময়ে সম্মেলনটি হচ্ছে, যখন ইউরোপের নিরাপত্তা ভবিষ্যৎ ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। গত বছর প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্রে ইউরোপকে “নিজ পায়ে দাঁড়াতে” এবং “নিজস্ব প্রতিরক্ষার প্রধান দায়িত্ব নিতে” বলা হয়েছে। এতে ইউরোপের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো আর আগের মতো ইউরোপের নিরাপত্তার মূল ভরসা হতে আগ্রহী নয়।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্কের ভেতর সবচেয়ে গভীর ফাটল ধরিয়েছে গ্রিনল্যান্ড সংকট। ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে তার গ্রিনল্যান্ড “দখল করা দরকার”। এক পর্যায়ে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও নাকচ করেননি তিনি। গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অধীন একটি স্বশাসিত অঞ্চল। ফলে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বৈরী সামরিক দখল ন্যাটো জোটের অবসান ঘটাবে, যে জোট গত ৭৭ বছর ধরে ইউরোপের নিরাপত্তার ভিত্তি। এই সংকট আপাতত স্থগিত থাকলেও একটি বড় প্রশ্ন ঝুলে রয়েছে-যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নিরাপত্তা সম্পর্ক কি অপূরণীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?

ব্রিটেনের সাবেক গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৬ প্রধান স্যার অ্যালেক্স ইয়াঙ্গার বলেন, এই সম্পর্ক আগের মতো নেই, তবে ভেঙেও যায়নি। তার ভাষায়, ইউরোপ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা, সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা থেকে ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়। তিনি মনে করেন, ইউরোপের নিজস্ব প্রতিরক্ষায় আরও বেশি দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প সঠিক ছিলেন। তিনি বলেন, ৫০ কোটি মানুষের ইউরোপ ৩০ কোটি মানুষের যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভর করে ১৪ কোটি মানুষের রাশিয়ার মোকাবিলা করতে চায়-এটা উল্টো হিসাব। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের করদাতারাই কার্যত ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যয় বহন করেছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের অসন্তোষের বড় কারণ।

তবে বিভাজন শুধু সামরিক ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাণিজ্য, অভিবাসন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ইউরোপের গভীর মতবিরোধ রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের রাশিয়াপন্থী অবস্থান এবং ইউক্রেনকে দোষারোপ করার প্রবণতাও ইউরোপীয় সরকারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের আগে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে গবেষণা পরিচালক টোবিয়াস বুন্ডে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী কৌশলের সঙ্গে এখন মৌলিক বিচ্ছেদ ঘটেছে। সেই কৌশল বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক সংহতি এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে এই তিনটি ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্রকে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সিএসআইএস ইউরোপের জন্য “বেদনাদায়ক ও চমকে দেওয়ার মতো সতর্কবার্তা” হিসেবে বর্ণনা করেছে। এতে ইউরোপীয় সরকারগুলোর বিরোধী শক্তিগুলোকে সমর্থনের কথাও বলা হয়েছে এবং ইউরোপের অভিবাসন নীতিকে “সভ্যতা ধ্বংসের ঝুঁকি” হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। তবুও নথিটিতে বলা হয়েছে, ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো-ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫ কি এখনো কার্যকর? এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, একটি সদস্য রাষ্ট্রে হামলা মানেই সব সদস্যের ওপর হামলা। কিন্তু ট্রাম্পের অনিশ্চিত অবস্থান ইউরোপকে সন্দিহান করে তুলেছে।

এস্তোনিয়ার সীমান্তবর্তী শহর নারভাকে ঘিরে বিশ্লেষকেরা যে ‘নারভা টেস্ট’-এর কথা বলছেন, তার মূল প্রশ্ন হলো-রাশিয়া যদি কোনো অজুহাতে ন্যাটোভুক্ত দেশ আক্রমণ করে, যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই এগিয়ে আসবে? গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দেওয়া একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের আচরণ ভবিষ্যৎ প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া কঠিন করে তুলেছে। আর ইউক্রেনের মতো একটি ইউরোপীয় দেশে যখন পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ চলছে, তখন এই অনিশ্চয়তা ভয়ংকর ভুল হিসাবের জন্ম দিতে পারে। এই সপ্তাহের মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন হয়তো জানাবে, ট্রান্সআটলান্টিক জোট কোন পথে এগোচ্ছে। তবে সেই উত্তর ইউরোপের প্রত্যাশার সঙ্গে মিলবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

-বেলাল হোসেন