সিডনিতে হার্জগবিরোধী বিক্ষোভে পুলিশি সহিংসতা, নতুন কর্মসূচির ঘোষণা

ছবিঃ সংগৃহীত

ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হার্জগের অস্ট্রেলিয়া সফরের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে পুলিশের কঠোর দমন-পীড়নের পর দেশটিতে আরও প্রতিবাদের প্রস্তুতি চলছে। রাজনৈতিক নেতা ও নাগরিক সংগঠনগুলো শান্ত থাকার আহ্বান জানালেও পুলিশের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। খবর আলজাজিরার।

প্যালেস্টাইন অ্যাকশন গ্রুপ সিডনি মঙ্গলবার বিকেলে সমর্থকদের একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, তারা “পুলিশি বর্বরতার” প্রতিবাদ জানাবে এবং যাকে তারা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে “সহিংস দমন” বলে বর্ণনা করেছে, তার দায়ে সরকার ও পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পদত্যাগ দাবি করবে। সোমবার সন্ধ্যায় সিডনির কেন্দ্রস্থলে সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যখন পুলিশ কর্তৃপক্ষ ঘোষিত নিষিদ্ধ এলাকায় হাজার হাজার শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীকে মিছিল করতে বাধা দেয়। আয়োজকদের দাবি, বিক্ষোভকারীর সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজারে পৌঁছেছিল।

বিক্ষোভের আয়োজকরা অভিযোগ করেন, পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর পেপার স্প্রে ব্যবহার করেছে এবং শারীরিক হামলা চালিয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, অন্তত ২৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ১০ জনের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের পার্লামেন্টে বিরোধী গ্রিনস দলের সদস্য অ্যাবিগেইল বয়েড বলেন, তিনি নিজে পুলিশের হাতে মারধরের শিকার হয়েছেন এবং অন্যদের ওপর পুলিশি সহিংসতা প্রত্যক্ষ করেছেন।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “পুলিশ দল বেঁধে মানুষের দিকে দৌড়ে যাচ্ছিল এবং তাদের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় ঠেলে দিচ্ছিল।” বয়েড বলেন, “সন্ধ্যার নামাজের সময় প্রায় ১২ জন মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে প্রার্থনা করছিলেন। পুলিশ তাদের নামাজের মাঝখানেই সরিয়ে দিতে চেয়েছিল।” তিনি জানান, এর কিছুক্ষণ পরই তাকে পুলিশ ঘুষি মারে। তার ভাষায়, “আমাকে মাটি থেকে তুলে ফেলা হয়। ভিডিওতে দেখা যাবে, ভারসাম্য ফেরানোর চেষ্টা করার সময় এক পুলিশ কর্মকর্তা আমার মাথায় ঘুষি মারেন, আরেকজন কাঁধে আঘাত করেন।” তিনি বলেন, “আমি বুঝতে পারছি না, এর কোনোটাই কীভাবে যৌক্তিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। আমি কোনো অন্যায় করিনি, আমার আশপাশের কেউও করেনি। পরে তারা নামাজরত মানুষদের টেনে ধরে আছাড় মেরে মাটিতে ফেলে দেয়। নামাজের চেয়ে শান্তিপূর্ণ কিছু হতে পারে না।” তিনি আরও বলেন, “এই মানুষদের সঙ্গে ভয়াবহ অমানবিক আচরণ করা হয়েছে।” ডেমোক্রেসি ইন কালার নামের অস্ট্রেলীয় বর্ণবাদবিরোধী সংগঠন আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের “অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে” গভীরভাবে আতঙ্কিত।

সংগঠনটির জাতীয় পরিচালক নূরা মানসুর বলেন, “গত রাতে যা ঘটেছে, তা কোনোভাবেই ‘কমিউনিটি সেফটি’ নয়। এটি ছিল মানবাধিকার রক্ষার দাবিতে সোচ্চার মানুষদের চুপ করিয়ে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সহিংস প্রদর্শন।” তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর পেপার স্প্রে ব্যবহার এবং নামাজরত মানুষদের ওপর হামলা মানুষের মর্যাদার গুরুতর লঙ্ঘন এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত। বিক্ষোভের আয়োজকরা বলেছেন, ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট হার্জগের সফরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর ক্ষেত্রে তিনি কোনোভাবেই দায়মুক্তি পেতে পারেন না। জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশন এর আগে হার্জগকে গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বাহিনীর গণহত্যায় উসকানি দেওয়ার জন্য দায়ী বলে উল্লেখ করেছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের অস্ট্রেলিয়া শাখা জানিয়েছে, “প্রেসিডেন্ট হার্জগকে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে স্বাগত জানানো জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের প্রতি অস্ট্রেলিয়ার অঙ্গীকারকে দুর্বল করে। আমরা নীরব থাকতে পারি না।” সংস্থাটি আরও বলে, “গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে প্রেসিডেন্ট হার্জগ গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর ভয়াবহ দুর্ভোগ চাপিয়ে দিয়েছেন-নির্লজ্জভাবে এবং সম্পূর্ণ দায়মুক্তির সঙ্গে।”

২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইসরায়েল গাজায় গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরু করে। এতে অন্তত ৭২ হাজার ৩২ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ঘোষিত সর্বশেষ যুদ্ধবিরতির পরও প্রায় ৬০০ জন নিহত হয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ ঘটনাবলিতে “মর্মাহত” হওয়ার কথা জানিয়ে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “অস্ট্রেলীয়রা দুটি জিনিস চায়। তারা এখানে সংঘাত আমদানি করতে চায় না। তারা চায় হত্যা বন্ধ হোক-তা ইসরায়েলি হোক বা ফিলিস্তিনি। কিন্তু তারা এই সংঘাতকে অস্ট্রেলিয়ায় দেখতে চায় না।”

ডিসেম্বরে সিডনির বন্ডাই বিচে একটি ইহুদি উৎসবে অংশ নেওয়া ১৫ জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনার পর আলবানিজের আমন্ত্রণে হার্জগ অস্ট্রেলিয়া সফরে আসেন। প্যালেস্টাইন অ্যাকশন গ্রুপ সিডনি এক বিবৃতিতে আটক বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রিমিয়ার ক্রিস মিনস ও পুলিশপ্রধান মাল ল্যানিয়নের পদত্যাগ দাবি করেছে। পুলিশপ্রধান ল্যানিয়ন দাবি করেন, তার বাহিনীর কর্মকাণ্ড যৌক্তিক ছিল এবং তিনি বিক্ষোভকারীদের “রাগান্বিত ও সহিংস জনতা” বলে উল্লেখ করেন। এক সংবাদ সম্মেলনে প্রিমিয়ার মিনস বলেন, পুলিশ কর্মকর্তারা “অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে” কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন, যার ফলে তারা এমন পদক্ষেপ নিয়েছেন।

-বেলাল হোসেন