জিম্বাবুয়েতে ক্রমেই বেশি মানুষ জীবনের চেয়ে মৃত্যুর প্রস্তুতিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। উচ্চমূল্যের চিকিৎসা বিমার বদলে স্বল্পমূল্যের শেষকৃত্য বা ফিউনারেল ইনস্যুরেন্সই এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় আর্থিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে।
হারারের নিম্ন আয়ের এলাকা কাম্বুজুমায় বসবাসকারী এনগোনি মুতাম্বারারোর চাচা, ৬০ বছর বয়সী স্টুয়ার্ট গান্ডা, জীবনের শেষ কয়েক মাস কাটিয়েছেন বাড়িতেই, কোনো চিকিৎসা সহায়তা ছাড়াই সুস্থ হওয়ার আশায়।
তাঁর পায়ে তীব্র ব্যথা ছিল, যার ফলে তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন এবং নিজের ছোট মুদি দোকানটিও চালাতে পারছিলেন না। জিম্বাবুয়ের লাখো মানুষের মতোই, যাদের কোনো স্বাস্থ্যবিমা নেই এবং হাসপাতালের খরচ বহন করার সামর্থ্যও নেই, গান্ডাও ভেবেছিলেন চিকিৎসা ছাড়াই হয়তো সেরে উঠবেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে পরিবারের অনুরোধে তাঁকে হারারের স্যালি মুগাবে সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রথমে চিকিৎসকেরা স্ট্রোকের আশঙ্কা করেছিলেন। পরে পরীক্ষা করে জানানো হয়, তাঁর কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতা থাকতে পারে এবং একজন বিশেষজ্ঞ নেফ্রোলজিস্টের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি-যার পরামর্শ ফি ছিল ৬০০ মার্কিন ডলার।
পরিবারের কোনো সঞ্চয় না থাকায় গত বছরের শেষ দিকে তাঁরা প্রায় এক মাস ধরে অর্থ জোগাড়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু তত দিনে অনেক দেরি হয়ে যায়।
“আমরা সেই টাকা জোগাড় করতে পারিনি,” ৩৯ বছর বয়সী মুতাম্বারারো আল জাজিরাকে বলেন। “হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার এক মাসের মধ্যেই তিনি মারা যান।”
এরপর অনুষ্ঠিত হয় তাঁর শেষকৃত্য। জীবনের শেষ সময় দারিদ্র্য আর যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে কাটলেও, তাঁর বিদায় ছিল অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ-কফিন, লাশবাহী গাড়ি, দাফনের সরঞ্জাম এবং ৬৫ আসনের একটি বাসে করে হারারে থেকে ১৩৫ কিলোমিটার দূরের নিজ গ্রাম ওয়েডজায় স্বজনদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হয়।
গান্ডা যেখানে মাসে গড়ে ২০০ ডলারের চিকিৎসা বিমা নিতে পারেননি-যা তাঁর রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা ব্যয় বহন করত-সেখানে তিনি নিয়মিত মাসে ১১ ডলার দিয়ে শেষকৃত্য বিমার কিস্তি পরিশোধ করতেন। এই বিমাটি দিয়েছিল ‘ন্যারাদজো গ্রুপ’, যা তাঁর মৃত্যুর পর সব আনুষ্ঠানিক ব্যয় বহন করে।
মৃত্যুর প্রস্তুতি, জীবনের নয়
গান্ডা কোনো ব্যতিক্রম নন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জিম্বাবুয়েতে এখন চিকিৎসা বিমার চেয়ে শেষকৃত্য বিমাই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থা।
দেশটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মরত মানুষের সংখ্যা ৯ লাখেরও কম। যদিও চাকরিজীবীদের জন্য চিকিৎসা বিমার প্রিমিয়াম বেতন থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেটে নেওয়া হয়, তবু প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ-অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ-কোনো স্বাস্থ্যবিমার আওতায় নেই। ২০২৩–২৪ সালের জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের সবাইকে চিকিৎসা খরচ নিজ পকেট থেকেই বহন করতে হয়।
অন্যদিকে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কাজ করা সংস্থা ফিনমার্ক ট্রাস্টের ২০২২ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমা করা জিম্বাবুয়ানদের মধ্যে ৭২ শতাংশের কাছে শেষকৃত্য বিমা রয়েছে, আর মাত্র ৩০ শতাংশের আছে স্বাস্থ্যবিমা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শেষকৃত্য বিমা শুধু সস্তাই নয়, বরং সাংস্কৃতিকভাবেও গ্রহণযোগ্য। জিম্বাবুয়ের সমাজে মৃত্যুর পর মর্যাদা রক্ষা অনেক সময় জীবনের নিরাপত্তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব পায়।
‘মৃত্যুর পরের জীবন গুরুত্বপূর্ণ’
জিম্বাবুয়ের অধিকাংশ মানুষের কাছেই চিকিৎসা বিমা একটি বিলাসিতা। ফলে তাঁরা বাধ্য হয়ে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু সরকারি হাসপাতালগুলোতে পরিকাঠামোর অভাব, ওষুধ সংকট এবং চিকিৎসক ও নার্সদের দেশত্যাগের কারণে সেবার মান খুবই নিম্ন।
যদিও কিছু বেসরকারি বিমা মাসে ১০ ডলার থেকে শুরু হয়, অনেক ক্ষেত্রে তা বেড়ে কয়েক শ ডলারে পৌঁছায়। অথচ দেশের ৬০ শতাংশ মানুষ দৈনিক ৩.৬৫ ডলারেরও কম আয়ে জীবনযাপন করেন।
অন্যদিকে, শেষকৃত্য বিমা অত্যন্ত সাশ্রয়ী। ইকোশিউরের পরিকল্পনা শুরু হয় মাত্র ০.৭৫ ডলার থেকে, আর জিমন্যাটের বিমা পাওয়া যায় ১ ডলার মাসিক প্রিমিয়ামে।
ডোভস হোল্ডিংস গ্রুপের জনসংযোগ ব্যবস্থাপক ইনোসেন্ট চুমা বলেন,
“শেষকৃত্য হঠাৎ ঘটে যাওয়া, এড়ানো যায় না-এবং এর সঙ্গে বড় আর্থিক ও সামাজিক দায় জড়িত। কিন্তু চিকিৎসা বিমায় খরচ অনিশ্চিত এবং বহনযোগ্য নয়।”
জিম্বাবুয়ে মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য চিকিৎসক বিবেক সোলাঙ্কি বলেন,
“আমাদের সংস্কৃতিতে মৃত্যুর পরের জীবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অসুস্থতা নিয়ে আগাম ভাবাকে অনেকেই অশুভ মনে করেন।”
ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থা, বাড়তে থাকা মৃত্যুর ব্যবসা
জিম্বাবুয়ের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা দীর্ঘদিনের অবহেলায় কার্যত ভেঙে পড়েছে। প্রতি ১,০০০ মানুষের জন্য হাসপাতালের শয্যা রয়েছে মাত্র ১.৭টি। মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি ১ লাখ জীবিত জন্মে ৪৬২ জন—যেখানে বৈশ্বিক গড় ১৯৭।
অন্যদিকে, শেষকৃত্য বিমা ব্যবসা ফুলে-ফেঁপে উঠছে। ২০২৪ সালে জীবনবিমা খাতের মোট আয়ের ৬৬ শতাংশ এসেছে শুধুমাত্র শেষকৃত্য বিমা থেকে।
ইকোশিউরের তথ্য অনুযায়ী, জিম্বাবুয়েতে একটি শেষকৃত্যের খরচ শহর ও আয়োজনভেদে ৮০০ থেকে ৩,০০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
আফ্রিকান আধ্যাত্মিক চিন্তাবিদ পিয়ারসন তাকাইঙ্গেই মারিন্ডা এই প্রবণতাকে আখ্যা দিয়েছেন “জীবনের বাণিজ্যিকীকরণ” হিসেবে।
তিনি বলেন, “আজ আমরা বাঁচার চেয়ে মরার প্রস্তুতিতে বেশি বাধ্য হচ্ছি।”
কমিউনিটির ভরসায় শেষযাত্রা
যাঁরা আনুষ্ঠানিক বিমা নিতে পারেন না, তাঁরা ভরসা রাখছেন স্থানীয় সমবায় বা অনানুষ্ঠানিক দাফন তহবিলের ওপর। এসব গোষ্ঠী শুধু কফিন নয়, খাবার, রান্নার সরঞ্জাম ও শোকাহত পরিবারের সহায়তাও দিয়ে থাকে।
হারারের কাছে জেগেদে গ্রামে গড়ে উঠেছে ‘জেগেদে বুরিয়াল সোসাইটি’। এখানে কোনো সদস্য মারা গেলে প্রত্যেকে ১০ ডলার করে দেন। ইতোমধ্যে তারা পাঁচটি পরিবারকে সহায়তা করেছে।
তবে গ্রামের নেতা চোমুদিসা জেগেদে বলেন,
“মৃত্যুর প্রস্তুতির পাশাপাশি আমাদের স্বাস্থ্য বিমার দিকেও নজর দিতে হবে।”
চিকিৎসক সোলাঙ্কিও একই মত পোষণ করেন। তিনি বলেন,
“স্বাস্থ্য এখন আর বিনামূল্যে নয়। প্রবাসী জিম্বাবুয়ানরা চাইলে তাঁদের পরিবারের স্বাস্থ্য বিমার খরচ বহন করে এই পরিবর্তনের সূচনা করতে পারেন।”
সূত্রঃ আল জাজিরা
বেলাল হোসেন/










